নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কেউ হয়তো প্রবল স্রোতে ভেসে গেছেন, কেউ চাপা পড়েছেন কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে। আবার উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় স্বজনদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট দেশটির উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীতীরের জনপদ, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষতি করে।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দুর্যোগে অন্তত ১ হাজার ৩৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ৪ হাজার ৯৯৬ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ১ হাজার ৯৬৭ জন নেপালি নাগরিক, নুয়াকোটের ২ হাজার ৩৪০ জন, প্রায় ১০০ জন নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারী এবং ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।এদিকে উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলোর পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নদীর স্রোতে ভেসে গেছে বহু মরদেহ
বন্যার উৎসস্থল রাসুয়া জেলা থেকে উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ পাওয়া গেছে বেশ দূরের এলাকায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, স্রোতের টানে অনেক মরদেহ রাসুয়া থেকে নুওয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানসহ বিভিন্ন এলাকায় ভেসে গেছে। কিছু মরদেহ নেপালের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেও পাওয়া গেছে।
এ কারণে নিখোঁজদের একটি অংশ এখনো নদীর তলদেশ, নদীর তীরের কাদা কিংবা ভাটির কোনো এলাকায় আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকারীরা।
মরদেহ মিলছে, পরিচয় মিলছে না
নিখোঁজদের সন্ধানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অশনাক্ত মরদেহ। ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেপাল পুলিশের হিসাবে ১ হাজার ৩০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। দাফনের আগে মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে পরবর্তী সময়ে স্বজনদের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
এর আগে ৩০ আগস্ট কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছিল, উদ্ধার হওয়া ৬৬৯টি মরদেহের মধ্যে মাত্র ২০টির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল। অনেক মরদেহ স্রোতে ভেসে কয়েক দশক কিলোমিটার দূরে চলে যায়। আবার কিছু মরদেহ কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকে।
অশনাক্ত মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল ও মর্গগুলোতেও চাপ তৈরি হয়েছে। সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে সব মরদেহ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য সংরক্ষণ করে কিছু মরদেহ গণকবর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ছবির মধ্যে স্বজনদের খোঁজ
রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে নিখোঁজদের ছবি নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘ওয়াল অব দ্য মিসিং’। প্রতিদিন সেখানে স্বজনেরা ভিড় করছেন—ছবির মধ্যে খুঁজছেন নিখোঁজ বাবা, মা, ভাই, বোন কিংবা সন্তানের মুখ।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি অশনাক্ত মরদেহের ছবিও রাখা হচ্ছে। পোশাক, গয়না, ট্যাটু কিংবা শরীরে থাকা অন্য কোনো চিহ্ন দেখে স্বজনেরা পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছেন।
টানেলের ভেতরেও আটকে শত শত মানুষ
নিখোঁজদের একটি বড় অংশ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক বলে ধারণা করা হচ্ছে। বন্যার সময় কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও টানেল প্লাবিত হয়ে যায় বা ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে পড়ে।প্রায় ৯০০ মানুষ এসব প্রকল্পের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে বন্ধ টানেল পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
তবে সব আশাও এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সম্প্রতি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি এক নেপালি নারীকে ১১ দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তার পরিবার এরই মধ্যে তাকে মৃত ধরে শোকের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিল।
তাই নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, স্বজনদের অপেক্ষাও তত দীর্ঘ হচ্ছে—কেউ মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায়, আবার কেউ এখনো প্রিয়জনের জীবিত ফিরে আসার আশায়।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, রয়টার্স ও এপি নিউজ
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কেউ হয়তো প্রবল স্রোতে ভেসে গেছেন, কেউ চাপা পড়েছেন কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে। আবার উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় স্বজনদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট দেশটির উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীতীরের জনপদ, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষতি করে।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দুর্যোগে অন্তত ১ হাজার ৩৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ৪ হাজার ৯৯৬ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ১ হাজার ৯৬৭ জন নেপালি নাগরিক, নুয়াকোটের ২ হাজার ৩৪০ জন, প্রায় ১০০ জন নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারী এবং ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।এদিকে উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলোর পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নদীর স্রোতে ভেসে গেছে বহু মরদেহ
বন্যার উৎসস্থল রাসুয়া জেলা থেকে উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ পাওয়া গেছে বেশ দূরের এলাকায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, স্রোতের টানে অনেক মরদেহ রাসুয়া থেকে নুওয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানসহ বিভিন্ন এলাকায় ভেসে গেছে। কিছু মরদেহ নেপালের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেও পাওয়া গেছে।
এ কারণে নিখোঁজদের একটি অংশ এখনো নদীর তলদেশ, নদীর তীরের কাদা কিংবা ভাটির কোনো এলাকায় আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকারীরা।
মরদেহ মিলছে, পরিচয় মিলছে না
নিখোঁজদের সন্ধানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অশনাক্ত মরদেহ। ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেপাল পুলিশের হিসাবে ১ হাজার ৩০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। দাফনের আগে মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে পরবর্তী সময়ে স্বজনদের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
এর আগে ৩০ আগস্ট কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছিল, উদ্ধার হওয়া ৬৬৯টি মরদেহের মধ্যে মাত্র ২০টির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল। অনেক মরদেহ স্রোতে ভেসে কয়েক দশক কিলোমিটার দূরে চলে যায়। আবার কিছু মরদেহ কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকে।
অশনাক্ত মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল ও মর্গগুলোতেও চাপ তৈরি হয়েছে। সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে সব মরদেহ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য সংরক্ষণ করে কিছু মরদেহ গণকবর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ছবির মধ্যে স্বজনদের খোঁজ
রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে নিখোঁজদের ছবি নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘ওয়াল অব দ্য মিসিং’। প্রতিদিন সেখানে স্বজনেরা ভিড় করছেন—ছবির মধ্যে খুঁজছেন নিখোঁজ বাবা, মা, ভাই, বোন কিংবা সন্তানের মুখ।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি অশনাক্ত মরদেহের ছবিও রাখা হচ্ছে। পোশাক, গয়না, ট্যাটু কিংবা শরীরে থাকা অন্য কোনো চিহ্ন দেখে স্বজনেরা পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছেন।
টানেলের ভেতরেও আটকে শত শত মানুষ
নিখোঁজদের একটি বড় অংশ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক বলে ধারণা করা হচ্ছে। বন্যার সময় কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও টানেল প্লাবিত হয়ে যায় বা ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে পড়ে।প্রায় ৯০০ মানুষ এসব প্রকল্পের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে বন্ধ টানেল পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
তবে সব আশাও এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সম্প্রতি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি এক নেপালি নারীকে ১১ দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তার পরিবার এরই মধ্যে তাকে মৃত ধরে শোকের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিল।
তাই নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, স্বজনদের অপেক্ষাও তত দীর্ঘ হচ্ছে—কেউ মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায়, আবার কেউ এখনো প্রিয়জনের জীবিত ফিরে আসার আশায়।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, রয়টার্স ও এপি নিউজ
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
আপনার মতামত লিখুন