English / বাংলা
Editorial News 24

চট্টগ্রাম বন্দরের ‘পি-শেড’-এর দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট ২৬টি লটে এসব অতিঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ফেলে রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ৮৩ টন বিপজ্জনক রাসায়নিক: চরম বিস্ফোরণ ঝুঁকি


প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ডাউনলোড কার্ড | ভুল রিপোর্ট
নিউজ পাঠান

চট্টগ্রাম বন্দরে ৮৩ টন বিপজ্জনক রাসায়নিক: চরম বিস্ফোরণ ঝুঁকি

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে জমে রয়েছে প্রায় ৮৩ মেট্রিক টন মেয়াদোত্তীর্ণ ও অত্যন্ত বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ। বন্দরের শেড ও ইয়ার্ডে গাদাগাদি করে রাখা এসব দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে অতি দাহ্য পদার্থ, বিস্ফোরক, মারাত্মক অ্যাসিড এবং বিষাক্ত শিল্প রাসায়নিক। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এসব রাসায়নিক দ্রুত সরিয়ে নেওয়া কিংবা ধ্বংস করার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগাদা দিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইল চালাচালির কারণে গত চার বছর ধরে আটকে রয়েছে এই অপসারণ প্রক্রিয়া।

চট্টগ্রাম বন্দরের ‘পি-শেড’-এর দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট ২৬টি লটে এসব অতিঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ফেলে রাখা হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে আসা চালানগুলোর মধ্যে রয়েছে ৫৫ হাজার কেজিরও বেশি অতি দাহ্য মিথানল, ৫৩ হাজার কেজির বেশি থিনার, ২৫ হাজার কেজির বেশি সোডিয়াম নাইট্রাইট এবং ২১ হাজার কেজিরও বেশি ক্ষতিকর সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিড। এছাড়া ২০২২ সাল বা তার আগে আসা চালানগুলোতে রয়েছে ২৮ হাজার কেজি পলি অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড, ১২ হাজার ৪২০ কেজি অত্যন্ত দাহ্য তরল আঠা এবং এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে বিষ ছড়ানো সাইপারমেথ্রিন ও ক্লোরপাইরিফসের মতো বিপজ্জনক কীটনাশক।

রাসায়নিক ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের মতে, জমে থাকা কেমিক্যালগুলোর রাসায়নিক ধর্ম অত্যন্ত সংবেদনশীল। মিথানল সামান্য স্ফুলিঙ্গ বা উচ্চ তাপমাত্রায় তীব্র বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। নাইট্রিক অ্যাসিড ক্ষয়কারী এবং তাপে বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন করে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যদিকে সোডিয়াম নাইট্রাইট একটি শক্তিশালী জারক, যা অন্য যেকোনো দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এলে মুহূর্তের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। এসব কেমিক্যাল বন্দরের অপারেশনাল এলাকার কাছে যেভাবে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে, তাতে তীব্র গরমে বা কোনো একটি কনটেইনারে দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগলে শৃঙ্খল বিক্রিয়ার (চেইন রিয়েকশন) মাধ্যমে পুরো চট্টগ্রাম বন্দর এক মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাসায়নিকগুলো বিনষ্ট করার বিষয়ে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের উপপ্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন জানান, এগুলো মাটির নিচে পুঁতে ফেললে মাটির গুণাগুণ চিরতরে নষ্ট হবে এবং জলাশয়ে ফেললে পানির অণুজীবসহ পুরো জলজ পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই নিরাপদ ও আধুনিক উপায়ে এগুলো বিনষ্ট করা প্রয়োজন। কিন্তু অপসারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্তত কাস্টমস কর্তৃপক্ষের উচিত ঝুঁকি এড়াতে এসব কেমিক্যালকে বন্দরের স্পর্শকাতর শেড থেকে নিরাপদ কোনো স্থানে সরিয়ে রাখা।

এদিকে সরকারি নথিপত্রে দেখা যায়, সরকারি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের (পিপিআর) ৭৬(১) বিধি অনুযায়ী এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি’ (ডিপিএম) অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিবের উপস্থিতিতে এক সভায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাফার্জ হোলসিমকে কেমিক্যাল ধ্বংসের দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাস্টমসের আর্থিক ও চুক্তিগত ক্ষমতা না থাকায় এবং ১৯৯৬ সালের ‘রুলস অব বিজনেস’-এর সীমাবদ্ধতায় বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়নি।

সরকারি কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠানের বিপজ্জনক পদার্থ ধ্বংস করার সক্ষমতা না থাকায় অবশেষে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) অধীনস্থ রাসায়নিক ও অস্ত্র কনভেনশনের (বিএনএসিডব্লিউসি) সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠায়। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাসেল আহমেদ জানান, গত ১৫ জুলাই তাদের পরিদর্শনের কথা থাকলেও প্রবল বৃষ্টি ও বন্যার কারণে তা স্থগিত হয়। পরবর্তীতে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তবে বন্দর ব্যবহারকারীদের দাবি, অর্থনীতির এই ‘লাইফলাইন’ রক্ষায় দ্রুত আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করে এসব বিপজ্জনক কেমিক্যাল অপসারণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


বিষয় : চট্টগ্রাম বন্দর রাসায়নিক চট্টগ্রামবন্দর রাসায়নিক ঝুঁকি

আপনার মতামত লিখুন

Editorial News 24

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


চট্টগ্রাম বন্দরে ৮৩ টন বিপজ্জনক রাসায়নিক: চরম বিস্ফোরণ ঝুঁকি

প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে জমে রয়েছে প্রায় ৮৩ মেট্রিক টন মেয়াদোত্তীর্ণ ও অত্যন্ত বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ। বন্দরের শেড ও ইয়ার্ডে গাদাগাদি করে রাখা এসব দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে অতি দাহ্য পদার্থ, বিস্ফোরক, মারাত্মক অ্যাসিড এবং বিষাক্ত শিল্প রাসায়নিক। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এসব রাসায়নিক দ্রুত সরিয়ে নেওয়া কিংবা ধ্বংস করার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগাদা দিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইল চালাচালির কারণে গত চার বছর ধরে আটকে রয়েছে এই অপসারণ প্রক্রিয়া।

চট্টগ্রাম বন্দরের ‘পি-শেড’-এর দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট ২৬টি লটে এসব অতিঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ফেলে রাখা হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে আসা চালানগুলোর মধ্যে রয়েছে ৫৫ হাজার কেজিরও বেশি অতি দাহ্য মিথানল, ৫৩ হাজার কেজির বেশি থিনার, ২৫ হাজার কেজির বেশি সোডিয়াম নাইট্রাইট এবং ২১ হাজার কেজিরও বেশি ক্ষতিকর সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিড। এছাড়া ২০২২ সাল বা তার আগে আসা চালানগুলোতে রয়েছে ২৮ হাজার কেজি পলি অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড, ১২ হাজার ৪২০ কেজি অত্যন্ত দাহ্য তরল আঠা এবং এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে বিষ ছড়ানো সাইপারমেথ্রিন ও ক্লোরপাইরিফসের মতো বিপজ্জনক কীটনাশক।

রাসায়নিক ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের মতে, জমে থাকা কেমিক্যালগুলোর রাসায়নিক ধর্ম অত্যন্ত সংবেদনশীল। মিথানল সামান্য স্ফুলিঙ্গ বা উচ্চ তাপমাত্রায় তীব্র বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। নাইট্রিক অ্যাসিড ক্ষয়কারী এবং তাপে বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন করে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যদিকে সোডিয়াম নাইট্রাইট একটি শক্তিশালী জারক, যা অন্য যেকোনো দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এলে মুহূর্তের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। এসব কেমিক্যাল বন্দরের অপারেশনাল এলাকার কাছে যেভাবে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে, তাতে তীব্র গরমে বা কোনো একটি কনটেইনারে দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগলে শৃঙ্খল বিক্রিয়ার (চেইন রিয়েকশন) মাধ্যমে পুরো চট্টগ্রাম বন্দর এক মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাসায়নিকগুলো বিনষ্ট করার বিষয়ে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের উপপ্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন জানান, এগুলো মাটির নিচে পুঁতে ফেললে মাটির গুণাগুণ চিরতরে নষ্ট হবে এবং জলাশয়ে ফেললে পানির অণুজীবসহ পুরো জলজ পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই নিরাপদ ও আধুনিক উপায়ে এগুলো বিনষ্ট করা প্রয়োজন। কিন্তু অপসারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্তত কাস্টমস কর্তৃপক্ষের উচিত ঝুঁকি এড়াতে এসব কেমিক্যালকে বন্দরের স্পর্শকাতর শেড থেকে নিরাপদ কোনো স্থানে সরিয়ে রাখা।

এদিকে সরকারি নথিপত্রে দেখা যায়, সরকারি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের (পিপিআর) ৭৬(১) বিধি অনুযায়ী এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি’ (ডিপিএম) অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিবের উপস্থিতিতে এক সভায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাফার্জ হোলসিমকে কেমিক্যাল ধ্বংসের দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাস্টমসের আর্থিক ও চুক্তিগত ক্ষমতা না থাকায় এবং ১৯৯৬ সালের ‘রুলস অব বিজনেস’-এর সীমাবদ্ধতায় বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়নি।

সরকারি কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠানের বিপজ্জনক পদার্থ ধ্বংস করার সক্ষমতা না থাকায় অবশেষে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) অধীনস্থ রাসায়নিক ও অস্ত্র কনভেনশনের (বিএনএসিডব্লিউসি) সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠায়। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাসেল আহমেদ জানান, গত ১৫ জুলাই তাদের পরিদর্শনের কথা থাকলেও প্রবল বৃষ্টি ও বন্যার কারণে তা স্থগিত হয়। পরবর্তীতে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তবে বন্দর ব্যবহারকারীদের দাবি, অর্থনীতির এই ‘লাইফলাইন’ রক্ষায় দ্রুত আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করে এসব বিপজ্জনক কেমিক্যাল অপসারণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন



Editorial News 24


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
google.com, pub-1718561036151648, DIRECT, f08c47fec0942fa0