দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নানা নাটকীয়তার পর ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান এবং ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। মিজরাহি বংশোদ্ভূত আইজেনকটের এই উত্থান ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলের মিজরাহি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সমর্থক হিসেবে পরিচিত। ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকটের পরিবার মরক্কো থেকে ইসরায়েলে অভিবাসন করে। তার বেড়ে ওঠা তিবেরিয়াস ও ইলাত শহরে। দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র থেকে দূরে বড় হলেও পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে পৌঁছান তিনি।
নিজের জাতিগত পরিচয় নিয়ে আইজেনকট খুব বেশি কথা বলেন না। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, মিজরাহি পরিচয় তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। কারণ, ইসরায়েলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো মিজরাহি ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেননি। আইজেনকট সরকার গঠন করতে পারলে সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে।
১৯৭৮ সালে গোলানি ব্রিগেডে যোগদানের মধ্য দিয়ে সামরিক জীবন শুরু করেন আইজেনকট। এরপর প্রায় চার দশকের কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ ছিলেন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন নেতানিয়াহু।
সেনাপ্রধান থাকাকালে ২০১৬ সালে হেবরনে এক ফিলিস্তিনি হামলাকারীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আহত অবস্থায় থাকা ওই ফিলিস্তিনিকে গুলি করেছিলেন ইসরায়েলি সেনাসদস্য সার্জেন্ট এলর আজারিয়া। নেতানিয়াহুসহ ডানপন্থী রাজনীতিকদের চাপ থাকা সত্ত্বেও আইজেনকট এ ঘটনার সামরিক তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। তার যুক্তি ছিল, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর ২০২২ সালে সাবেক আরেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজের সঙ্গে রাজনীতিতে যোগ দেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় অংশ নেন তারা। তবে যুদ্ধের পর কী করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকার অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের জুনে দুজনই মন্ত্রিসভা ছাড়েন।
গাজা যুদ্ধে আইজেনকটের পরিবারও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধের দ্বিতীয় মাসে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হয়ে লড়াই করার সময় নিহত হন তার ২৫ বছর বয়সী ছোট ছেলে গাল। একই যুদ্ধে প্রাণ হারান তার দুই ভাতিজাও।
গত এপ্রিলে ইসরায়েলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ছেলের স্মৃতিচারণা করেন আইজেনকট। সেখানে তিনি লেখেন, ‘গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে এবং তার বন্ধুরা যে মূল্য দিয়েছে, যাদের সে চিনত এবং যাদের চিনত না, তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেব না।’ নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই অঙ্গীকারকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক আচরণের দিক থেকে নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। তার দলের নাম ‘ইয়াশার’, যার হিব্রু অর্থ ‘সোজা’ বা ‘সঠিক’। ৭ অক্টোবরের হামলায় জিম্মি হওয়া সাবেক জিম্মি এলি শারাবির একটি বক্তব্য থেকে দলটির নাম নেওয়া হয়েছে। শারাবির বক্তব্য ছিল, রাজনীতি ডানপন্থী বা বামপন্থী হওয়ার বিষয় নয়, বরং সঠিক পথে থাকার বিষয়।
তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রশ্নে আইজেনকটকে কঠোর অবস্থানের সমর্থক হিসেবেই দেখা হয়। গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রতি তার সমর্থন রয়েছে। সামরিক কৌশলবিদ হিসেবে তিনি ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’-এর সঙ্গে যুক্ত। এই নীতিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা প্রতিরোধের যুক্তিতে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগের কথা বলা হয়।
এ ছাড়া ‘ক্যাম্পেইন বিটুইন ওয়ারস’ নামের সামরিক কৌশলের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু না করেই সীমিত ও গোপন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া।
ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক দুর্বল করার বিষয়ে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের অবস্থানে মিল রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে শুধু সামরিক অভিযান চালানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন আইজেনকট। তার মতে, সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগও প্রয়োজন।
গাজা যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। আইজেনকটের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন এবং এর ফলে ইসরায়েলি জিম্মিদের জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকাও তার সমালোচনার অন্যতম কারণ। এসব মতবিরোধের জেরেই তিনি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আইজেনকটের অবস্থানও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটাতে ১৮ মাসের সময়সীমা নির্ধারণের কথা বলেছেন তিনি। এ লক্ষ্য অর্জনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অথবা তার ভাষায় ‘সৃজনশীল’ সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্যও অনেকটা একই রকম। তবে আইজেনকটের দাবি, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে হামাসের শাসনের অবসান সম্ভব হবে না।
রাজনীতিতে আসার আগে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে একসময় দ্বিজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন আইজেনকট। তিনি একে ‘ইহুদিবাদী স্বপ্নের সমাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করে আসছেন তিনি। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এ সমাধানের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের ‘ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে’ রয়েছেন বলে মন্তব্য করেন। তবে এর পরিবর্তে ফিলিস্তিন সমস্যার কী সমাধান হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেননি।
অন্যদিকে পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করা এবং সেখানে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেন আইজেনকট। পশ্চিম তীরের বিতর্কিত ই১ এলাকায় নতুন বসতি নির্মাণের পরিকল্পনাকে তিনি ভুল বলে মন্তব্য করেছেন। তার আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে যেসব কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার অভিযোগ, বর্তমান সরকার নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আইজেনকটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি নিজের সমর্থন প্রকাশ করেছেন। অক্টোবরের শুরুর দিকে নেতানিয়াহুকে ‘সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন’ দেওয়ার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে ‘একজন মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ বলে উল্লেখ করেন। অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে সেটি ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলেও সতর্ক করেছিলেন ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে একাই ইরানের মোকাবিলা করতে হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আইজেনকট ও বিরোধী দলের অন্য নেতারা রিপাবলিকান দলের বড় দাতা মরিয়ম অ্যাডেলসনসহ কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে হোয়াইট হাউসকে ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০১৭ সালে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, ২০১৮ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং ২০২৫-২০২৬ সালে ইরানে হামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোতে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক রাভিদ ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিলেন, নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি কাজ করতে পারবেন কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো পারব, হয়তো পারব না। কে এই ঝুঁকি নিতে চায়?’
তবে গত এক বছরে নেতানিয়াহুর কিছু পদক্ষেপ ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কয়েকজন সদস্যের অসন্তোষের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে লেবানন ও গাজায় ইসরায়েলি হামলা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্র ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচকে বাদ দিয়ে আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থার দিকে যেতে পারে। এতে আঞ্চলিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আইজেনকটের সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের অন্যতম কূটনৈতিক লক্ষ্য।
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নানা নাটকীয়তার পর ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান এবং ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। মিজরাহি বংশোদ্ভূত আইজেনকটের এই উত্থান ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলের মিজরাহি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সমর্থক হিসেবে পরিচিত। ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকটের পরিবার মরক্কো থেকে ইসরায়েলে অভিবাসন করে। তার বেড়ে ওঠা তিবেরিয়াস ও ইলাত শহরে। দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র থেকে দূরে বড় হলেও পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে পৌঁছান তিনি।
নিজের জাতিগত পরিচয় নিয়ে আইজেনকট খুব বেশি কথা বলেন না। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, মিজরাহি পরিচয় তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। কারণ, ইসরায়েলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো মিজরাহি ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেননি। আইজেনকট সরকার গঠন করতে পারলে সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে।
১৯৭৮ সালে গোলানি ব্রিগেডে যোগদানের মধ্য দিয়ে সামরিক জীবন শুরু করেন আইজেনকট। এরপর প্রায় চার দশকের কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ ছিলেন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন নেতানিয়াহু।
সেনাপ্রধান থাকাকালে ২০১৬ সালে হেবরনে এক ফিলিস্তিনি হামলাকারীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আহত অবস্থায় থাকা ওই ফিলিস্তিনিকে গুলি করেছিলেন ইসরায়েলি সেনাসদস্য সার্জেন্ট এলর আজারিয়া। নেতানিয়াহুসহ ডানপন্থী রাজনীতিকদের চাপ থাকা সত্ত্বেও আইজেনকট এ ঘটনার সামরিক তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। তার যুক্তি ছিল, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর ২০২২ সালে সাবেক আরেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজের সঙ্গে রাজনীতিতে যোগ দেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় অংশ নেন তারা। তবে যুদ্ধের পর কী করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকার অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের জুনে দুজনই মন্ত্রিসভা ছাড়েন।
গাজা যুদ্ধে আইজেনকটের পরিবারও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধের দ্বিতীয় মাসে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হয়ে লড়াই করার সময় নিহত হন তার ২৫ বছর বয়সী ছোট ছেলে গাল। একই যুদ্ধে প্রাণ হারান তার দুই ভাতিজাও।
গত এপ্রিলে ইসরায়েলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ছেলের স্মৃতিচারণা করেন আইজেনকট। সেখানে তিনি লেখেন, ‘গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে এবং তার বন্ধুরা যে মূল্য দিয়েছে, যাদের সে চিনত এবং যাদের চিনত না, তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেব না।’ নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই অঙ্গীকারকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক আচরণের দিক থেকে নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। তার দলের নাম ‘ইয়াশার’, যার হিব্রু অর্থ ‘সোজা’ বা ‘সঠিক’। ৭ অক্টোবরের হামলায় জিম্মি হওয়া সাবেক জিম্মি এলি শারাবির একটি বক্তব্য থেকে দলটির নাম নেওয়া হয়েছে। শারাবির বক্তব্য ছিল, রাজনীতি ডানপন্থী বা বামপন্থী হওয়ার বিষয় নয়, বরং সঠিক পথে থাকার বিষয়।
তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রশ্নে আইজেনকটকে কঠোর অবস্থানের সমর্থক হিসেবেই দেখা হয়। গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রতি তার সমর্থন রয়েছে। সামরিক কৌশলবিদ হিসেবে তিনি ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’-এর সঙ্গে যুক্ত। এই নীতিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা প্রতিরোধের যুক্তিতে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগের কথা বলা হয়।
এ ছাড়া ‘ক্যাম্পেইন বিটুইন ওয়ারস’ নামের সামরিক কৌশলের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু না করেই সীমিত ও গোপন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া।
ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক দুর্বল করার বিষয়ে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের অবস্থানে মিল রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে শুধু সামরিক অভিযান চালানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন আইজেনকট। তার মতে, সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগও প্রয়োজন।
গাজা যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। আইজেনকটের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন এবং এর ফলে ইসরায়েলি জিম্মিদের জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকাও তার সমালোচনার অন্যতম কারণ। এসব মতবিরোধের জেরেই তিনি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আইজেনকটের অবস্থানও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটাতে ১৮ মাসের সময়সীমা নির্ধারণের কথা বলেছেন তিনি। এ লক্ষ্য অর্জনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অথবা তার ভাষায় ‘সৃজনশীল’ সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্যও অনেকটা একই রকম। তবে আইজেনকটের দাবি, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে হামাসের শাসনের অবসান সম্ভব হবে না।
রাজনীতিতে আসার আগে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে একসময় দ্বিজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন আইজেনকট। তিনি একে ‘ইহুদিবাদী স্বপ্নের সমাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করে আসছেন তিনি। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এ সমাধানের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের ‘ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে’ রয়েছেন বলে মন্তব্য করেন। তবে এর পরিবর্তে ফিলিস্তিন সমস্যার কী সমাধান হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেননি।
অন্যদিকে পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করা এবং সেখানে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেন আইজেনকট। পশ্চিম তীরের বিতর্কিত ই১ এলাকায় নতুন বসতি নির্মাণের পরিকল্পনাকে তিনি ভুল বলে মন্তব্য করেছেন। তার আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে যেসব কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার অভিযোগ, বর্তমান সরকার নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আইজেনকটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি নিজের সমর্থন প্রকাশ করেছেন। অক্টোবরের শুরুর দিকে নেতানিয়াহুকে ‘সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন’ দেওয়ার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে ‘একজন মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ বলে উল্লেখ করেন। অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে সেটি ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলেও সতর্ক করেছিলেন ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে একাই ইরানের মোকাবিলা করতে হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আইজেনকট ও বিরোধী দলের অন্য নেতারা রিপাবলিকান দলের বড় দাতা মরিয়ম অ্যাডেলসনসহ কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে হোয়াইট হাউসকে ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০১৭ সালে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, ২০১৮ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং ২০২৫-২০২৬ সালে ইরানে হামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোতে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক রাভিদ ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিলেন, নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি কাজ করতে পারবেন কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো পারব, হয়তো পারব না। কে এই ঝুঁকি নিতে চায়?’
তবে গত এক বছরে নেতানিয়াহুর কিছু পদক্ষেপ ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কয়েকজন সদস্যের অসন্তোষের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে লেবানন ও গাজায় ইসরায়েলি হামলা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্র ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচকে বাদ দিয়ে আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থার দিকে যেতে পারে। এতে আঞ্চলিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আইজেনকটের সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের অন্যতম কূটনৈতিক লক্ষ্য।
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
আপনার মতামত লিখুন