রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, রহস্য যেন ততই জটিল হয়ে উঠছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৩৫টি আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হলেও আসামিদের ডিএনএ নমুনা এখনো সংগ্রহ করা হয়নি। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময়, উদ্দেশ্য ও ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল—এসব প্রশ্নেরও এখনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী।
সিআইডি ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৩৫টি আলামত সংগ্রহ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১২ দিন পর গত দুই দিনে তিন দফায় এসব আলামত ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।আলামতের মধ্যে রয়েছে ফল কাটার চাকু, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, নানরুটি, শসা ও খেজুর, বেসিনের দাগ এবং নিহত শিশু প্রিয়মের খাতায় পাওয়া একটি লেখা। ফরেনসিক পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিআইডি থেকে পাওয়া সব আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর কারাগারে থাকা আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এ মামলায় আসামিদের নমুনা দ্রুত সংগ্রহ করা প্রয়োজন ছিল। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের পর সেগুলো ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাতে কেন প্রায় ১২ দিন সময় লাগল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, নিহত গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের ডিএনএ নমুনা ইতোমধ্যে সংগ্রহ করে রেখেছে সিআইডি। আসামিদের নমুনা সংগ্রহের পর ফরেনসিক পরীক্ষার তথ্যের সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে দেখা হবে। মিল পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।সিআইডির রংপুর কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, ঘটনার দিন বিশেষজ্ঞ ইন্সপেক্টর মিল্লাতের নেতৃত্বে ৩৫টির বেশি আলামত সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে এসব তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুধু মাদক নয়, হত্যার নেপথ্যে কী?
হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকে মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, চারজনকে হত্যার পেছনে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে।
ঘটনার পরপরই পুলিশের দুই দফা সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবির কারণে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ বাড়ছে।
অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ঘটনার সময় বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকা, নিহত আগামী চক্রবর্তীর ভোর ৫টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত কথোপকথনের স্ক্রিনশট, ময়নাতদন্তের তথ্য এবং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে দুই আসামির প্রায় ৮০ বার ফোনালাপ—সবকিছুই নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া আগামী চক্রবর্তীর প্রেমিক অদিত করের আড়ালে থাকা, হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস আগে আসামিদের পরিবারের জমি বিক্রির বায়না এবং চারজনকে হত্যা করা হলেও প্রতিবেশীরা কোনো শব্দ না শোনার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত দুই দিন জেলগেটে প্রায় তিন ঘণ্টা করে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে এসব জিজ্ঞাসাবাদ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। যদিও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে পুলিশ।
ময়নাতদন্তের তথ্যেও অসংগতি
ময়নাতদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চারজনের পাকস্থলী খাবারে পূর্ণ এবং মূত্রথলি খালি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা দাবি করেছে, তারা ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের শ্বাসরোধে হত্যা করেছে। এই দুই তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের তথ্য সামনে আসার পর তদন্ত নতুন দিক থেকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কেন আড়ালে অদিত কর?
আগামী চক্রবর্তী নিহত হওয়ার পর তার প্রেমিক অদিত কর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট দেন। এর মাধ্যমে তাদের সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। কিন্তু এরপর থেকেই তিনি গণমাধ্যমের সামনে আসছেন না।আরপিএমপির সাবেক কমিশনার আবদুল মাবুদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী চক্রবর্তীর ফোন বন্ধ পাওয়ার পর ২১ ও ২২ আগস্ট অদিত কর একাধিকবার তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াত করেছিলেন এবং সেখানে থাকা কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গেও কথা বলেছিলেন।
অদিত কেন এখনো প্রকাশ্যে কথা বলছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তার ভাই সন্দীপ কর জানিয়েছেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় অদিত সবার কাছ থেকে দূরে রয়েছেন। পুলিশের কাছে যা বলার, তিনি তা জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন সন্দীপ।
হত্যাকাণ্ডের সময় নিয়েও ধোঁয়াশা
গণপতি চক্রবর্তীর মোবাইলের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তার শেষ ইনকামিং কলটি এসেছিল ২০ আগস্ট বিকেলে তার স্ত্রীর মোবাইল থেকে। ফোনটি ২১ আগস্ট ভোর ৬টা ৫ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
অন্যদিকে ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতি চক্রবর্তী এবং দুই আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মোবাইল একই টাওয়ার এলাকায় থাকলেও তারা একই স্থানে ছিলেন না। ফলে ঠিক কখন এবং কোথায় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে, সেই প্রশ্নেরও এখনো নিশ্চিত উত্তর নেই।
সিদ্ধার্থের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার আগে এলাকায় অস্বাভাবিক মোটরসাইকেল চলাচলের কথা বলা হলেও তার বাড়ি থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরের সিসিটিভি ফুটেজে তেমন কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। তবে ঘটনার ভোরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তদন্তকারীরা।
হত্যার আগে ১২ ঘণ্টায় ৩০ ফোন
তদন্তে দুই আসামির ফোনকলের অস্বাভাবিক তথ্যও উঠে এসেছে। ১৯ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৮০ ঘণ্টার কল ডিটেইলস রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মধ্যে মোট ৮০ বার ফোনে যোগাযোগ হয়েছে।
এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ তার দুটি নম্বর থেকে মুগ্ধের একটি নম্বরে ৩০ বার ফোন করেন। এসব কলের বেশির ভাগের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১১ থেকে ১৭ সেকেন্ড। কয়েকটি কথোপকথনে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত থাকায় তদন্তে সন্দেহভাজনের তালিকাও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
১৫ লাখ টাকা নিয়ে হত্যার গুঞ্জন
হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর্থিক কারণ হিসেবে গণপতি চক্রবর্তীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকার কথা ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর নগরীর কাচারী বাজারের সোনালী ব্যাংক শাখায় থাকা ওই অর্থ থেকে গণপতি কোনো টাকা তোলেননি।
নথিপত্র অনুযায়ী, এলপিআরে থাকায় তার পেনশনের অর্থ পাওয়ার সুযোগও ছিল না। ফলে শুধু আর্থিক লাভের জন্য পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে—এমন তত্ত্বের পক্ষে এখনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হত্যার দেড় মাস আগে বাড়ি বিক্রির বায়না
মামলার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পরস্পরের পিসতুতো ও মামাতো ভাই। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাসের বাড়ি ছিল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশেই।
হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগে তারা প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র দাসের কাছে ৩৫ লাখ টাকায় ওই বাড়ি বিক্রির বায়না করেন। দলিল সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে জানা গেছে।
স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানের মালিক বিধান চন্দ্র দাসও প্রায় দেড় মাস আগে বায়না করে বাড়িটি কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কী ঘটেছিল ২২ আগস্ট রাতে?
গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় একই এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মামলাটি বর্তমানে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে।
তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
চারজনকে হত্যার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারীদের শনাক্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটিও তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সংগঠনটির রংপুর মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বলেন, আসামিদের আরও বিস্তৃতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি দেরিতে ডোপ টেস্ট, ঘটনার আগে তথ্যদাতার পরিচয়, হত্যার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ এবং ফরেনসিক আলামত ১২ দিন পর পাঠানোর বিষয়গুলোও তদন্ত করা জরুরি।
তার মতে, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। ইতোমধ্যে এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন আত্মগোপনে চলে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সব মিলিয়ে চার খুনের এই ঘটনায় একাধিক সূত্র সামনে এলেও হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য, সময়, নেপথ্যের পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। ফরেনসিক পরীক্ষার ফল ও পরবর্তী তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কি না, এখন সেদিকেই নজর।
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, রহস্য যেন ততই জটিল হয়ে উঠছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৩৫টি আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হলেও আসামিদের ডিএনএ নমুনা এখনো সংগ্রহ করা হয়নি। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময়, উদ্দেশ্য ও ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল—এসব প্রশ্নেরও এখনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী।
সিআইডি ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৩৫টি আলামত সংগ্রহ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১২ দিন পর গত দুই দিনে তিন দফায় এসব আলামত ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।আলামতের মধ্যে রয়েছে ফল কাটার চাকু, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, নানরুটি, শসা ও খেজুর, বেসিনের দাগ এবং নিহত শিশু প্রিয়মের খাতায় পাওয়া একটি লেখা। ফরেনসিক পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিআইডি থেকে পাওয়া সব আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর কারাগারে থাকা আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এ মামলায় আসামিদের নমুনা দ্রুত সংগ্রহ করা প্রয়োজন ছিল। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের পর সেগুলো ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাতে কেন প্রায় ১২ দিন সময় লাগল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, নিহত গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের ডিএনএ নমুনা ইতোমধ্যে সংগ্রহ করে রেখেছে সিআইডি। আসামিদের নমুনা সংগ্রহের পর ফরেনসিক পরীক্ষার তথ্যের সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে দেখা হবে। মিল পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।সিআইডির রংপুর কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, ঘটনার দিন বিশেষজ্ঞ ইন্সপেক্টর মিল্লাতের নেতৃত্বে ৩৫টির বেশি আলামত সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে এসব তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুধু মাদক নয়, হত্যার নেপথ্যে কী?
হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকে মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, চারজনকে হত্যার পেছনে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে।
ঘটনার পরপরই পুলিশের দুই দফা সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবির কারণে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ বাড়ছে।
অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ঘটনার সময় বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকা, নিহত আগামী চক্রবর্তীর ভোর ৫টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত কথোপকথনের স্ক্রিনশট, ময়নাতদন্তের তথ্য এবং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে দুই আসামির প্রায় ৮০ বার ফোনালাপ—সবকিছুই নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া আগামী চক্রবর্তীর প্রেমিক অদিত করের আড়ালে থাকা, হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস আগে আসামিদের পরিবারের জমি বিক্রির বায়না এবং চারজনকে হত্যা করা হলেও প্রতিবেশীরা কোনো শব্দ না শোনার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত দুই দিন জেলগেটে প্রায় তিন ঘণ্টা করে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে এসব জিজ্ঞাসাবাদ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। যদিও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে পুলিশ।
ময়নাতদন্তের তথ্যেও অসংগতি
ময়নাতদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চারজনের পাকস্থলী খাবারে পূর্ণ এবং মূত্রথলি খালি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা দাবি করেছে, তারা ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের শ্বাসরোধে হত্যা করেছে। এই দুই তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের তথ্য সামনে আসার পর তদন্ত নতুন দিক থেকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কেন আড়ালে অদিত কর?
আগামী চক্রবর্তী নিহত হওয়ার পর তার প্রেমিক অদিত কর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট দেন। এর মাধ্যমে তাদের সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। কিন্তু এরপর থেকেই তিনি গণমাধ্যমের সামনে আসছেন না।আরপিএমপির সাবেক কমিশনার আবদুল মাবুদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী চক্রবর্তীর ফোন বন্ধ পাওয়ার পর ২১ ও ২২ আগস্ট অদিত কর একাধিকবার তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াত করেছিলেন এবং সেখানে থাকা কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গেও কথা বলেছিলেন।
অদিত কেন এখনো প্রকাশ্যে কথা বলছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তার ভাই সন্দীপ কর জানিয়েছেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় অদিত সবার কাছ থেকে দূরে রয়েছেন। পুলিশের কাছে যা বলার, তিনি তা জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন সন্দীপ।
হত্যাকাণ্ডের সময় নিয়েও ধোঁয়াশা
গণপতি চক্রবর্তীর মোবাইলের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তার শেষ ইনকামিং কলটি এসেছিল ২০ আগস্ট বিকেলে তার স্ত্রীর মোবাইল থেকে। ফোনটি ২১ আগস্ট ভোর ৬টা ৫ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
অন্যদিকে ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতি চক্রবর্তী এবং দুই আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মোবাইল একই টাওয়ার এলাকায় থাকলেও তারা একই স্থানে ছিলেন না। ফলে ঠিক কখন এবং কোথায় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে, সেই প্রশ্নেরও এখনো নিশ্চিত উত্তর নেই।
সিদ্ধার্থের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার আগে এলাকায় অস্বাভাবিক মোটরসাইকেল চলাচলের কথা বলা হলেও তার বাড়ি থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরের সিসিটিভি ফুটেজে তেমন কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। তবে ঘটনার ভোরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তদন্তকারীরা।
হত্যার আগে ১২ ঘণ্টায় ৩০ ফোন
তদন্তে দুই আসামির ফোনকলের অস্বাভাবিক তথ্যও উঠে এসেছে। ১৯ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৮০ ঘণ্টার কল ডিটেইলস রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মধ্যে মোট ৮০ বার ফোনে যোগাযোগ হয়েছে।
এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ তার দুটি নম্বর থেকে মুগ্ধের একটি নম্বরে ৩০ বার ফোন করেন। এসব কলের বেশির ভাগের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১১ থেকে ১৭ সেকেন্ড। কয়েকটি কথোপকথনে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত থাকায় তদন্তে সন্দেহভাজনের তালিকাও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
১৫ লাখ টাকা নিয়ে হত্যার গুঞ্জন
হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর্থিক কারণ হিসেবে গণপতি চক্রবর্তীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকার কথা ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর নগরীর কাচারী বাজারের সোনালী ব্যাংক শাখায় থাকা ওই অর্থ থেকে গণপতি কোনো টাকা তোলেননি।
নথিপত্র অনুযায়ী, এলপিআরে থাকায় তার পেনশনের অর্থ পাওয়ার সুযোগও ছিল না। ফলে শুধু আর্থিক লাভের জন্য পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে—এমন তত্ত্বের পক্ষে এখনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হত্যার দেড় মাস আগে বাড়ি বিক্রির বায়না
মামলার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পরস্পরের পিসতুতো ও মামাতো ভাই। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাসের বাড়ি ছিল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশেই।
হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগে তারা প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র দাসের কাছে ৩৫ লাখ টাকায় ওই বাড়ি বিক্রির বায়না করেন। দলিল সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে জানা গেছে।
স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানের মালিক বিধান চন্দ্র দাসও প্রায় দেড় মাস আগে বায়না করে বাড়িটি কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কী ঘটেছিল ২২ আগস্ট রাতে?
গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় একই এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মামলাটি বর্তমানে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে।
তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
চারজনকে হত্যার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারীদের শনাক্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটিও তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সংগঠনটির রংপুর মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বলেন, আসামিদের আরও বিস্তৃতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি দেরিতে ডোপ টেস্ট, ঘটনার আগে তথ্যদাতার পরিচয়, হত্যার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ এবং ফরেনসিক আলামত ১২ দিন পর পাঠানোর বিষয়গুলোও তদন্ত করা জরুরি।
তার মতে, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। ইতোমধ্যে এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন আত্মগোপনে চলে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সব মিলিয়ে চার খুনের এই ঘটনায় একাধিক সূত্র সামনে এলেও হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য, সময়, নেপথ্যের পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। ফরেনসিক পরীক্ষার ফল ও পরবর্তী তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কি না, এখন সেদিকেই নজর।
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
আপনার মতামত লিখুন