সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যে বিরোধপূর্ণ আবিয়েই অঞ্চলের একটি বাজারে ড্রোন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ জনে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবারের এ হামলার পর বাজারটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষের মরদেহ পুড়ে গেছে। এখনো উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ঘটনার পর প্রায় আট হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের হামলায় সুদানে নিহতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সংঘাতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।
আবিয়েই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত তথ্যমন্ত্রী ইয়োহানা আকোল এনগর মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সোমবারের হামলার পর প্রথমে ৭৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে উদ্ধারকাজ চলার সঙ্গে সঙ্গে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ জনে পৌঁছায়।এনগর বলেন, আগুন এখনো জ্বলছে এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আগুনে কয়েকজনের মরদেহ পুরোপুরি পুড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে ধারণ করা একটি ভিডিও যাচাই করেছে রয়টার্স। এতে পুড়ে যাওয়া ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন এবং ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। ক্ষয়ক্ষতি দেখতে স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে জড়ো হওয়ার সময়ও একটি ভবনে আগুন জ্বলছিল।হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন এনগর। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্স সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।তিনজন কূটনীতিক, একজন ত্রাণকর্মী ও সংঘাতবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় বাজারের একটি জ্বালানি ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে ডিপোটি আরএসএফের যোদ্ধাদের জ্বালানি সরবরাহে ব্যবহৃত হতো। এ বিষয়ে আরএসএফের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
আবিয়েই নিয়ে সুদান ও দক্ষিণ সুদানের বিরোধ
২০১১ সালে সুদান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দক্ষিণ সুদান। এরপর থেকেই তেলসমৃদ্ধ আবিয়েই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। অঞ্চলটি যৌথভাবে পরিচালিত হয়। এর সীমান্ত রয়েছে সুদানের কর্দোফান অঞ্চলের সঙ্গে, যা বর্তমানে দেশটির যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংঘাতপূর্ণ এলাকা।
সুদানের সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আবিয়েইয়ের কয়েকটি এলাকায় আরএসএফ সক্রিয় রয়েছে। তবে অঞ্চলটিতে আরএসএফের উপস্থিতির দাবি নাকচ করেছেন এনগর। উভয় পক্ষের বক্তব্যের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
গত মে মাসে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী আবিয়েই নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ) সতর্ক করে বলেছিল, অঞ্চলটিতে আরএসএফের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আবিয়েইয়ের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও জাতিসংঘের কর্মীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।
আবিয়েইসহ সুদানের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক। নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সুদানজুড়ে একের পর এক ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।তিনি আরও বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের ক্ষতি সামলাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর এসব হামলার প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ।
বিস্ফোরণের পর বাজারে আগুন
এনগর জানিয়েছেন, হামলার পর বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকর্মীরা মরদেহ উদ্ধারে বাধার মুখে পড়ছেন। এ ঘটনায় প্রায় আট হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার গভীর রাতে এক বিবৃতিতে জানায়, আবিয়েই শহরের উত্তরে একটি বাজারে ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে বিবৃতিতে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে সুদানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে বলেও জানায় মন্ত্রণালয়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, হামলার আগে তিনি পরপর পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন। এর পরপরই জ্বালানির বাজারটিতে আগুন ধরে যায়। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আহতদের সরিয়ে নেওয়ার সময় তাঁদের পেট ও পায়ে বিস্ফোরণের টুকরার আঘাত দেখতে পান। একটি স্থানে তিনি আগুনে পুড়ে যাওয়া ২৮টি মরদেহ দেখেছেন বলেও জানান।ওই প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, বাজারে আরএসএফ কিংবা অন্য কোনো বাহিনীর ইউনিফর্ম পরা যোদ্ধা তাঁর চোখে পড়েনি। বাজারটিতে চিনি, ময়দা ও বিস্কুটের মতো পণ্য বিক্রি হতো, যেগুলো সুদানে পাঠানো হয়।
বাড়ছে ড্রোন হামলা ও প্রাণহানি
সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ড্রোন হামলার ঘটনা বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিয়ালা শহর এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় জরুরি সাড়া প্রদানকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সুদানের পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যে ড্রোন হামলায় প্রায় ৮৪ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হন। রাজ্যটির বড় অংশ আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সোমবার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরেও একাধিক ড্রোন হামলা হয়। এতে চার শিশু নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিয়ালা শহরের একটি বাজারে হামলায় ২৩ জন নিহত ও ৪৪ জন আহত হন।
এদিকে, চাদের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, সুদানের সেনাবাহিনী তাদের ভূখণ্ডেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, চাদের ভূখণ্ড নিয়মিতভাবে আরএসএফের রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়।সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত আগস্টের শেষ দিকে জানিয়েছিল, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী কাজ করছে। এ ছাড়া গত ১০ অক্টোবর সুদান ও মিসরের সীমান্তের কাছে এক বিমান হামলায় ৭০ জনের বেশি খনিজ উত্তোলনকারী শ্রমিক নিহত হন বলে জানিয়েছে একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা।
চিকিৎসাসেবার সংকটে আহতরা
আবিয়েই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা চলছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের কারণে এলাকাটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাজুক। সাম্প্রতিক হামলাটিকে কয়েক বছরের মধ্যে অঞ্চলটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতিও রয়েছে।দক্ষিণ সুদান সরকার জানিয়েছে, প্রতিবেশী সুদানের যুদ্ধে তারা কোনো পক্ষ নেয়নি। তবে কূটনীতিক ও সংঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আরএসএফের রসদ সরবরাহে আবিয়েই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রন্তিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, আবিয়েইয়ের কাছাকাছি আমেথ বেক হাসপাতালে তারা ২০ জনের বেশি আহত ব্যক্তির চিকিৎসা দিচ্ছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন আগুনে পুড়ে গেছেন।হাসপাতালটিতে এমএসএফের চিকিৎসা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডাউয়ার বলেন, আহতদের অস্ত্রোপচার, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
এমএসএফের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ব্যান্ডেজ বাঁধা কয়েকজন রোগী হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে আছেন। সেখানে আহতদের চিকিৎসা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬
সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যে বিরোধপূর্ণ আবিয়েই অঞ্চলের একটি বাজারে ড্রোন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ জনে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবারের এ হামলার পর বাজারটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষের মরদেহ পুড়ে গেছে। এখনো উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ঘটনার পর প্রায় আট হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের হামলায় সুদানে নিহতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সংঘাতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।
আবিয়েই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত তথ্যমন্ত্রী ইয়োহানা আকোল এনগর মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সোমবারের হামলার পর প্রথমে ৭৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে উদ্ধারকাজ চলার সঙ্গে সঙ্গে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ জনে পৌঁছায়।এনগর বলেন, আগুন এখনো জ্বলছে এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আগুনে কয়েকজনের মরদেহ পুরোপুরি পুড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে ধারণ করা একটি ভিডিও যাচাই করেছে রয়টার্স। এতে পুড়ে যাওয়া ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন এবং ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। ক্ষয়ক্ষতি দেখতে স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে জড়ো হওয়ার সময়ও একটি ভবনে আগুন জ্বলছিল।হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন এনগর। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্স সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।তিনজন কূটনীতিক, একজন ত্রাণকর্মী ও সংঘাতবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় বাজারের একটি জ্বালানি ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে ডিপোটি আরএসএফের যোদ্ধাদের জ্বালানি সরবরাহে ব্যবহৃত হতো। এ বিষয়ে আরএসএফের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
আবিয়েই নিয়ে সুদান ও দক্ষিণ সুদানের বিরোধ
২০১১ সালে সুদান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দক্ষিণ সুদান। এরপর থেকেই তেলসমৃদ্ধ আবিয়েই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। অঞ্চলটি যৌথভাবে পরিচালিত হয়। এর সীমান্ত রয়েছে সুদানের কর্দোফান অঞ্চলের সঙ্গে, যা বর্তমানে দেশটির যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংঘাতপূর্ণ এলাকা।
সুদানের সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আবিয়েইয়ের কয়েকটি এলাকায় আরএসএফ সক্রিয় রয়েছে। তবে অঞ্চলটিতে আরএসএফের উপস্থিতির দাবি নাকচ করেছেন এনগর। উভয় পক্ষের বক্তব্যের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
গত মে মাসে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী আবিয়েই নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ) সতর্ক করে বলেছিল, অঞ্চলটিতে আরএসএফের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আবিয়েইয়ের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও জাতিসংঘের কর্মীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।
আবিয়েইসহ সুদানের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক। নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সুদানজুড়ে একের পর এক ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।তিনি আরও বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের ক্ষতি সামলাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর এসব হামলার প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ।
বিস্ফোরণের পর বাজারে আগুন
এনগর জানিয়েছেন, হামলার পর বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকর্মীরা মরদেহ উদ্ধারে বাধার মুখে পড়ছেন। এ ঘটনায় প্রায় আট হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার গভীর রাতে এক বিবৃতিতে জানায়, আবিয়েই শহরের উত্তরে একটি বাজারে ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে বিবৃতিতে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে সুদানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে বলেও জানায় মন্ত্রণালয়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, হামলার আগে তিনি পরপর পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন। এর পরপরই জ্বালানির বাজারটিতে আগুন ধরে যায়। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আহতদের সরিয়ে নেওয়ার সময় তাঁদের পেট ও পায়ে বিস্ফোরণের টুকরার আঘাত দেখতে পান। একটি স্থানে তিনি আগুনে পুড়ে যাওয়া ২৮টি মরদেহ দেখেছেন বলেও জানান।ওই প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, বাজারে আরএসএফ কিংবা অন্য কোনো বাহিনীর ইউনিফর্ম পরা যোদ্ধা তাঁর চোখে পড়েনি। বাজারটিতে চিনি, ময়দা ও বিস্কুটের মতো পণ্য বিক্রি হতো, যেগুলো সুদানে পাঠানো হয়।
বাড়ছে ড্রোন হামলা ও প্রাণহানি
সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ড্রোন হামলার ঘটনা বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিয়ালা শহর এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় জরুরি সাড়া প্রদানকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সুদানের পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যে ড্রোন হামলায় প্রায় ৮৪ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হন। রাজ্যটির বড় অংশ আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সোমবার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরেও একাধিক ড্রোন হামলা হয়। এতে চার শিশু নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিয়ালা শহরের একটি বাজারে হামলায় ২৩ জন নিহত ও ৪৪ জন আহত হন।
এদিকে, চাদের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, সুদানের সেনাবাহিনী তাদের ভূখণ্ডেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, চাদের ভূখণ্ড নিয়মিতভাবে আরএসএফের রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়।সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত আগস্টের শেষ দিকে জানিয়েছিল, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী কাজ করছে। এ ছাড়া গত ১০ অক্টোবর সুদান ও মিসরের সীমান্তের কাছে এক বিমান হামলায় ৭০ জনের বেশি খনিজ উত্তোলনকারী শ্রমিক নিহত হন বলে জানিয়েছে একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা।
চিকিৎসাসেবার সংকটে আহতরা
আবিয়েই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা চলছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের কারণে এলাকাটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাজুক। সাম্প্রতিক হামলাটিকে কয়েক বছরের মধ্যে অঞ্চলটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতিও রয়েছে।দক্ষিণ সুদান সরকার জানিয়েছে, প্রতিবেশী সুদানের যুদ্ধে তারা কোনো পক্ষ নেয়নি। তবে কূটনীতিক ও সংঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আরএসএফের রসদ সরবরাহে আবিয়েই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রন্তিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, আবিয়েইয়ের কাছাকাছি আমেথ বেক হাসপাতালে তারা ২০ জনের বেশি আহত ব্যক্তির চিকিৎসা দিচ্ছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন আগুনে পুড়ে গেছেন।হাসপাতালটিতে এমএসএফের চিকিৎসা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডাউয়ার বলেন, আহতদের অস্ত্রোপচার, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
এমএসএফের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ব্যান্ডেজ বাঁধা কয়েকজন রোগী হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে আছেন। সেখানে আহতদের চিকিৎসা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
আপনার মতামত লিখুন