English / বাংলা
Editorial News 24

১৭৯৫ সালে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন হিসেবে যাত্রা শুরু করে আজ ২৩১ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত সুরক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় নিরাপত্তায় বাহিনীটির গৌরবময় ইতিহাস জানুন।

ঐতিহ্যের ২৩১ বছর: রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)


প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ডাউনলোড কার্ড | ভুল রিপোর্ট
নিউজ পাঠান

ঐতিহ্যের ২৩১ বছর: রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর নাম। প্রায় আড়াই শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করা এই বাহিনী শুধু সীমান্ত পাহারা দেয় না, বরং জাতীয় সংকট, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

১৭৯৫ সালের ২৯ জুন ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে শুরু হওয়া এ বাহিনীর পথচলা আজ ২৩১ বছরের গৌরবময় ইতিহাসে সমৃদ্ধ। সময়ের প্রয়োজনে নাম, কাঠামো ও দায়িত্বে পরিবর্তন এলেও দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল লক্ষ্য কখনো বদলায়নি।

রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে বিজিবি

১৭৯৫ সালের ২৯ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ গঠন করে। এটি ছিল উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন আধাসামরিক বাহিনী।

পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটির নাম পরিবর্তিত হয়। ১৮৬১ সালে এর নাম হয় ফ্রন্টিয়ার গার্ড, পরে স্পেশাল রিজার্ভ কোম্পানি, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) নামে পরিচিতি লাভ করে।

২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির পর বাহিনীটির পুনর্গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এর নতুন নামকরণ করা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজিবির অবদান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিজিবির পূর্বসূরি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবজনক।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর ইপিআরের অসংখ্য সদস্য বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সীমান্ত এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহায়তা প্রদান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ইপিআর সদস্যদের অবদান ছিল অসামান্য।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বহু সদস্য শহীদ হন এবং অনেকে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় খেতাব লাভ করেন।

সীমান্ত সুরক্ষায় প্রথম সারির প্রহরী

বর্তমানে বিজিবির প্রধান দায়িত্ব হলো বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত রক্ষা, সীমান্ত অপরাধ দমন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ।

প্রায় ৪,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তে বিজিবি সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। চোরাচালান, মাদক পাচার, মানবপাচার, অস্ত্র ও স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে বাহিনীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও বিজিবি সক্রিয়।

জাতীয় সংকটে বিজিবির ভূমিকা

সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জাতীয় সংকটেও বিজিবিকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেয় বাহিনীটি। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা এবং বিশেষ অভিযানে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ করে বিজিবি।

আধুনিকায়নের পথে বিজিবি

গত এক দশকে বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক আধুনিকায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। নতুন সীমান্ত চৌকি, আধুনিক যানবাহন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা যুক্ত হয়েছে বাহিনীতে।

স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট, ড্রোন নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আত্মত্যাগ ও পেশাদারিত্বের প্রতীক

দীর্ঘ ২৩১ বছরের ইতিহাসে বিজিবির অসংখ্য সদস্য দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক সাহসী সদস্য।

তাদের আত্মত্যাগ এবং পেশাদারিত্বের কারণেই বিজিবি আজ দেশের অন্যতম আস্থাভাজন নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

উপসংহার

রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে শুরু হয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে রূপান্তরিত হওয়া এই বাহিনীর ইতিহাস মূলত দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের ইতিহাস। ২৩১ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে বিজিবি আজও সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার নিয়ে ১৭৯৫ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই অঙ্গীকার আজও সমানভাবে অটুট রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

Editorial News 24

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


ঐতিহ্যের ২৩১ বছর: রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর নাম। প্রায় আড়াই শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করা এই বাহিনী শুধু সীমান্ত পাহারা দেয় না, বরং জাতীয় সংকট, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

১৭৯৫ সালের ২৯ জুন ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে শুরু হওয়া এ বাহিনীর পথচলা আজ ২৩১ বছরের গৌরবময় ইতিহাসে সমৃদ্ধ। সময়ের প্রয়োজনে নাম, কাঠামো ও দায়িত্বে পরিবর্তন এলেও দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল লক্ষ্য কখনো বদলায়নি।

রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে বিজিবি

১৭৯৫ সালের ২৯ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ গঠন করে। এটি ছিল উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন আধাসামরিক বাহিনী।

পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটির নাম পরিবর্তিত হয়। ১৮৬১ সালে এর নাম হয় ফ্রন্টিয়ার গার্ড, পরে স্পেশাল রিজার্ভ কোম্পানি, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) নামে পরিচিতি লাভ করে।

২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির পর বাহিনীটির পুনর্গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এর নতুন নামকরণ করা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজিবির অবদান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিজিবির পূর্বসূরি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবজনক।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর ইপিআরের অসংখ্য সদস্য বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সীমান্ত এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহায়তা প্রদান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ইপিআর সদস্যদের অবদান ছিল অসামান্য।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বহু সদস্য শহীদ হন এবং অনেকে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় খেতাব লাভ করেন।

সীমান্ত সুরক্ষায় প্রথম সারির প্রহরী

বর্তমানে বিজিবির প্রধান দায়িত্ব হলো বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত রক্ষা, সীমান্ত অপরাধ দমন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ।

প্রায় ৪,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তে বিজিবি সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। চোরাচালান, মাদক পাচার, মানবপাচার, অস্ত্র ও স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে বাহিনীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও বিজিবি সক্রিয়।

জাতীয় সংকটে বিজিবির ভূমিকা

সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জাতীয় সংকটেও বিজিবিকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেয় বাহিনীটি। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা এবং বিশেষ অভিযানে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ করে বিজিবি।

আধুনিকায়নের পথে বিজিবি

গত এক দশকে বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক আধুনিকায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। নতুন সীমান্ত চৌকি, আধুনিক যানবাহন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা যুক্ত হয়েছে বাহিনীতে।

স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট, ড্রোন নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আত্মত্যাগ ও পেশাদারিত্বের প্রতীক

দীর্ঘ ২৩১ বছরের ইতিহাসে বিজিবির অসংখ্য সদস্য দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক সাহসী সদস্য।

তাদের আত্মত্যাগ এবং পেশাদারিত্বের কারণেই বিজিবি আজ দেশের অন্যতম আস্থাভাজন নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

উপসংহার

রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে শুরু হয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে রূপান্তরিত হওয়া এই বাহিনীর ইতিহাস মূলত দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের ইতিহাস। ২৩১ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে বিজিবি আজও সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার নিয়ে ১৭৯৫ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই অঙ্গীকার আজও সমানভাবে অটুট রয়েছে।


Editorial News 24


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
google.com, pub-1718561036151648, DIRECT, f08c47fec0942fa0