আজও বাংলার মুসলিম সমাজে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় একজন সংস্কারক, দাঈ ও নবজাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে।
হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) ১৭৮১ সালের দিকে (অনেক ঐতিহাসিকের মতে ১৭৮১ বা ১৭৮২) তৎকালীন ফরিদপুর জেলার শামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি স্থানীয়ভাবে কুরআন ও ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।
শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানার্জনের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে ভারত হয়ে পবিত্র মক্কায় গমন করেন।
মক্কায় তিনি প্রায় দুই দশক অবস্থান করেন। সেখানে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসিরসহ ইসলামের বিভিন্ন শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। সে সময় আরব উপদ্বীপে চলমান ইসলামী সংস্কারধারার সঙ্গেও তিনি পরিচিত হন।
হজ পালন শেষে দেশে ফিরে তিনি উপলব্ধি করেন, বাংলার মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ ধর্মীয় শিক্ষা ও সুন্নাহভিত্তিক জীবন থেকে দূরে সরে গেছে।
দেশে ফিরে হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) দেখেন—
ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা বেড়েছে।
নানা কুসংস্কার, লোকাচার ও বিদআত সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে।
অনেক মুসলমান ফরজ ইবাদতের প্রতি উদাসীন।
কৃষকরা জমিদার ও নীলকরদের শোষণের শিকার।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতা তাঁকে সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করে।
বাংলায় ফিরে তিনি যে আন্দোলনের সূচনা করেন, তা ইতিহাসে ফরায়েজী আন্দোলন নামে পরিচিত।
'ফরায়েজ' শব্দটি এসেছে 'ফরজ' থেকে। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের ফরজ ইবাদতের প্রতি ফিরিয়ে আনা এবং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবন গড়ে তোলা।
তিনি মানুষকে আহ্বান জানান—
তাওহিদের প্রতি অবিচল থাকতে,
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করতে,
রোজা, যাকাত ও অন্যান্য ফরজ বিধান যথাযথভাবে পালন করতে,
কুসংস্কার ও বিদআত বর্জন করতে,
ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষা অনুসরণ করতে।
হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)-এর আন্দোলন শুধু ধর্মীয় সংস্কারে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি নিপীড়িত কৃষকদের অধিকার রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে সময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারে সাধারণ কৃষকরা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন।
তাঁর অনুসারীরা অনেক এলাকায় কৃষকদের সংগঠিত করেন এবং অন্যায় খাজনা ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতকে ইসলামী রাজনৈতিক পরিভাষায় দারুল হারব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তিনি কিছু ধর্মীয় বিষয়ে নিজস্ব ফিকহভিত্তিক মত প্রকাশ করেন।
তবে এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ ও ইসলামী আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। ফলে বিষয়টি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই মূল্যায়ন করা হয়।
ফরায়েজী আন্দোলন দ্রুত ফরিদপুর, ঢাকা, মাদারীপুর, বিক্রমপুর, বরিশালসহ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
হাজার হাজার মানুষ তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেন। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং ধর্মীয়ভাবে সচেতন মুসলমানদের মধ্যে আন্দোলনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) ইন্তেকাল করার পর তাঁর পুত্র দুধু মিয়া (মোহসিনউদ্দিন আহমদ) আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
দুধু মিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয় এবং কৃষকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এটি নতুন মাত্রা পায়।
ঐতিহাসিকরা হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)-এর অবদানকে কয়েকটি কারণে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন—
বাংলায় ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
মুসলমানদের ফরজ ইবাদতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন।
কুসংস্কার ও ধর্মীয় বিকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
নিপীড়িত কৃষকদের অধিকার রক্ষায় জনমত গড়ে তোলেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় মুসলিম সমাজে আত্মমর্যাদা ও ঐক্যের চেতনা জাগিয়ে তোলেন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) শুধু একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন; তিনি বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারক।
আজও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফরায়েজী আন্দোলন ইতিহাসের গবেষণা, ইসলামী চিন্তাধারা এবং বাংলার সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
বাংলার মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় ও ধর্মীয় চেতনার পুনর্জাগরণে তাঁর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)-কে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
আজও বাংলার মুসলিম সমাজে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় একজন সংস্কারক, দাঈ ও নবজাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে।
হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) ১৭৮১ সালের দিকে (অনেক ঐতিহাসিকের মতে ১৭৮১ বা ১৭৮২) তৎকালীন ফরিদপুর জেলার শামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি স্থানীয়ভাবে কুরআন ও ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।
শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানার্জনের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে ভারত হয়ে পবিত্র মক্কায় গমন করেন।
মক্কায় তিনি প্রায় দুই দশক অবস্থান করেন। সেখানে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসিরসহ ইসলামের বিভিন্ন শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। সে সময় আরব উপদ্বীপে চলমান ইসলামী সংস্কারধারার সঙ্গেও তিনি পরিচিত হন।
হজ পালন শেষে দেশে ফিরে তিনি উপলব্ধি করেন, বাংলার মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ ধর্মীয় শিক্ষা ও সুন্নাহভিত্তিক জীবন থেকে দূরে সরে গেছে।
দেশে ফিরে হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) দেখেন—
ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা বেড়েছে।
নানা কুসংস্কার, লোকাচার ও বিদআত সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে।
অনেক মুসলমান ফরজ ইবাদতের প্রতি উদাসীন।
কৃষকরা জমিদার ও নীলকরদের শোষণের শিকার।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতা তাঁকে সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করে।
বাংলায় ফিরে তিনি যে আন্দোলনের সূচনা করেন, তা ইতিহাসে ফরায়েজী আন্দোলন নামে পরিচিত।
'ফরায়েজ' শব্দটি এসেছে 'ফরজ' থেকে। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের ফরজ ইবাদতের প্রতি ফিরিয়ে আনা এবং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবন গড়ে তোলা।
তিনি মানুষকে আহ্বান জানান—
তাওহিদের প্রতি অবিচল থাকতে,
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করতে,
রোজা, যাকাত ও অন্যান্য ফরজ বিধান যথাযথভাবে পালন করতে,
কুসংস্কার ও বিদআত বর্জন করতে,
ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষা অনুসরণ করতে।
হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)-এর আন্দোলন শুধু ধর্মীয় সংস্কারে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি নিপীড়িত কৃষকদের অধিকার রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে সময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারে সাধারণ কৃষকরা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন।
তাঁর অনুসারীরা অনেক এলাকায় কৃষকদের সংগঠিত করেন এবং অন্যায় খাজনা ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতকে ইসলামী রাজনৈতিক পরিভাষায় দারুল হারব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তিনি কিছু ধর্মীয় বিষয়ে নিজস্ব ফিকহভিত্তিক মত প্রকাশ করেন।
তবে এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ ও ইসলামী আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। ফলে বিষয়টি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই মূল্যায়ন করা হয়।
ফরায়েজী আন্দোলন দ্রুত ফরিদপুর, ঢাকা, মাদারীপুর, বিক্রমপুর, বরিশালসহ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
হাজার হাজার মানুষ তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেন। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং ধর্মীয়ভাবে সচেতন মুসলমানদের মধ্যে আন্দোলনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) ইন্তেকাল করার পর তাঁর পুত্র দুধু মিয়া (মোহসিনউদ্দিন আহমদ) আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
দুধু মিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয় এবং কৃষকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এটি নতুন মাত্রা পায়।
ঐতিহাসিকরা হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)-এর অবদানকে কয়েকটি কারণে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন—
বাংলায় ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
মুসলমানদের ফরজ ইবাদতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন।
কুসংস্কার ও ধর্মীয় বিকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
নিপীড়িত কৃষকদের অধিকার রক্ষায় জনমত গড়ে তোলেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় মুসলিম সমাজে আত্মমর্যাদা ও ঐক্যের চেতনা জাগিয়ে তোলেন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) শুধু একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন; তিনি বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারক।
আজও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফরায়েজী আন্দোলন ইতিহাসের গবেষণা, ইসলামী চিন্তাধারা এবং বাংলার সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
বাংলার মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় ও ধর্মীয় চেতনার পুনর্জাগরণে তাঁর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)-কে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
আপনার মতামত লিখুন