ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে চট্টগ্রাম ছিল বঙ্গোপসাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অঞ্চলটি আরাকান রাজ্য (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল) এবং তাদের মিত্র পর্তুগিজ জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সে সময় চট্টগ্রাম ছিল জলদস্যুতা, দাস ব্যবসা এবং উপকূলীয় হামলার অন্যতম কেন্দ্র। আরাকান ও পর্তুগিজদের যৌথ আক্রমণে বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রায়ই অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হতো। ফলে বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করে।
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চট্টগ্রাম পুনর্দখলের সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় বাংলার সুবাদার ছিলেন শায়েস্তা খান।
১৬৬৫ সালের শেষ দিকে শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম অভিযানের প্রস্তুতি নেন। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তাঁর পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান। স্থল ও নৌ—দুই দিক থেকেই সুপরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়।
মুঘল বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় নৌবাহিনী এবং আরাকান শাসনের বিরোধী কিছু শক্তিও যুক্ত হয়েছিল। কয়েক দিনের তীব্র যুদ্ধের পর ১৬৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি মুঘল বাহিনী চট্টগ্রাম দখলে সফল হয়। আরাকান বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং বহু পর্তুগিজও অঞ্চল ছেড়ে পালিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম বিজয়ের পর মুঘল প্রশাসন শহরের নতুন নাম দেয় ‘ইসলামাবাদ’।
মুঘল আমলে নতুন বিজিত অঞ্চল বা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রের নতুন নামকরণ ছিল একটি প্রচলিত রীতি। ‘ইসলামাবাদ’ নামটি ছিল মুঘল শাসনের প্রতিষ্ঠা, নতুন প্রশাসনিক কাঠামো এবং সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্বের প্রতীক।
ইতিহাসবিদদের মতে, নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছিল যে শহরটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এবং এখানে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।
মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠার পর চট্টগ্রামে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে।
সমুদ্রপথে জলদস্যুদের তৎপরতা কমে আসে এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরে আসে। আরব, পারস্য, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যবসায়ীদের জন্য চট্টগ্রাম আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরে পরিণত হয়।
মুঘল প্রশাসন দুর্গ নির্মাণ, কর ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং বন্দর পরিচালনায় নতুন ব্যবস্থা চালু করে। এর ফলে শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।
মুঘল শাসনের সময় চট্টগ্রামে ইসলামি শিক্ষা, মসজিদ নির্মাণ এবং সুফি সংস্কৃতির প্রসার আরও জোরদার হয়।
যদিও চট্টগ্রামে মুসলিম আগমন ও ইসলাম প্রচার এরও বহু আগে শুরু হয়েছিল, তবে মুঘল আমলে প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নতুন মাত্রা লাভ করে।
মুঘল আমলের সরকারি দলিল, মানচিত্র ও প্রশাসনিক নথিতে দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রামকে ‘ইসলামাবাদ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে ‘চট্টগ্রাম’ (Chittagong) নামটি সরকারি ব্যবহারে ফিরে আসে। স্বাধীন বাংলাদেশের পরও ঐতিহাসিক নাম ‘চট্টগ্রাম’ বহাল থাকে এবং বর্তমানে সরকারি ইংরেজি নাম Chattogram ব্যবহৃত হচ্ছে।
১৬৬৬ সালের চট্টগ্রাম বিজয় ছিল শুধু একটি সামরিক সাফল্য নয়; এটি ছিল বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক ইতিহাসে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা।
এই বিজয়ের ফলে আরাকান শাসনের অবসান ঘটে, জলদস্যুদের আধিপত্য কমে আসে, সমুদ্রবাণিজ্যে নতুন গতি ফিরে আসে এবং চট্টগ্রাম মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীতে পরিণত হয়।
'ইসলামাবাদ' নামটি আজ আর সরকারি ব্যবহারে নেই। তবুও এটি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক, যা স্মরণ করিয়ে দেয়—একটি বিজয় কীভাবে একটি শহরের রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বদলে দিতে পারে।
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে চট্টগ্রাম ছিল বঙ্গোপসাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অঞ্চলটি আরাকান রাজ্য (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল) এবং তাদের মিত্র পর্তুগিজ জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সে সময় চট্টগ্রাম ছিল জলদস্যুতা, দাস ব্যবসা এবং উপকূলীয় হামলার অন্যতম কেন্দ্র। আরাকান ও পর্তুগিজদের যৌথ আক্রমণে বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রায়ই অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হতো। ফলে বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করে।
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চট্টগ্রাম পুনর্দখলের সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় বাংলার সুবাদার ছিলেন শায়েস্তা খান।
১৬৬৫ সালের শেষ দিকে শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম অভিযানের প্রস্তুতি নেন। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তাঁর পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান। স্থল ও নৌ—দুই দিক থেকেই সুপরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়।
মুঘল বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় নৌবাহিনী এবং আরাকান শাসনের বিরোধী কিছু শক্তিও যুক্ত হয়েছিল। কয়েক দিনের তীব্র যুদ্ধের পর ১৬৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি মুঘল বাহিনী চট্টগ্রাম দখলে সফল হয়। আরাকান বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং বহু পর্তুগিজও অঞ্চল ছেড়ে পালিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম বিজয়ের পর মুঘল প্রশাসন শহরের নতুন নাম দেয় ‘ইসলামাবাদ’।
মুঘল আমলে নতুন বিজিত অঞ্চল বা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রের নতুন নামকরণ ছিল একটি প্রচলিত রীতি। ‘ইসলামাবাদ’ নামটি ছিল মুঘল শাসনের প্রতিষ্ঠা, নতুন প্রশাসনিক কাঠামো এবং সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্বের প্রতীক।
ইতিহাসবিদদের মতে, নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছিল যে শহরটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এবং এখানে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।
মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠার পর চট্টগ্রামে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে।
সমুদ্রপথে জলদস্যুদের তৎপরতা কমে আসে এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরে আসে। আরব, পারস্য, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যবসায়ীদের জন্য চট্টগ্রাম আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরে পরিণত হয়।
মুঘল প্রশাসন দুর্গ নির্মাণ, কর ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং বন্দর পরিচালনায় নতুন ব্যবস্থা চালু করে। এর ফলে শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।
মুঘল শাসনের সময় চট্টগ্রামে ইসলামি শিক্ষা, মসজিদ নির্মাণ এবং সুফি সংস্কৃতির প্রসার আরও জোরদার হয়।
যদিও চট্টগ্রামে মুসলিম আগমন ও ইসলাম প্রচার এরও বহু আগে শুরু হয়েছিল, তবে মুঘল আমলে প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নতুন মাত্রা লাভ করে।
মুঘল আমলের সরকারি দলিল, মানচিত্র ও প্রশাসনিক নথিতে দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রামকে ‘ইসলামাবাদ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে ‘চট্টগ্রাম’ (Chittagong) নামটি সরকারি ব্যবহারে ফিরে আসে। স্বাধীন বাংলাদেশের পরও ঐতিহাসিক নাম ‘চট্টগ্রাম’ বহাল থাকে এবং বর্তমানে সরকারি ইংরেজি নাম Chattogram ব্যবহৃত হচ্ছে।
১৬৬৬ সালের চট্টগ্রাম বিজয় ছিল শুধু একটি সামরিক সাফল্য নয়; এটি ছিল বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক ইতিহাসে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা।
এই বিজয়ের ফলে আরাকান শাসনের অবসান ঘটে, জলদস্যুদের আধিপত্য কমে আসে, সমুদ্রবাণিজ্যে নতুন গতি ফিরে আসে এবং চট্টগ্রাম মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীতে পরিণত হয়।
'ইসলামাবাদ' নামটি আজ আর সরকারি ব্যবহারে নেই। তবুও এটি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক, যা স্মরণ করিয়ে দেয়—একটি বিজয় কীভাবে একটি শহরের রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বদলে দিতে পারে।
 (1500 x 470 px)_20260524_154935_0000.png)
আপনার মতামত লিখুন