English / বাংলা
Editorial News 24

১ জুলাইয়ের রক্তাক্ত স্মৃতি, অপারেশন থান্ডারবোল্ট এবং বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর: ২০১৬ সালের সেই বিভীষিকাময় রাতে কী ঘটেছিল?


প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ডাউনলোড কার্ড | ভুল রিপোর্ট
নিউজ পাঠান

হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর: ২০১৬ সালের সেই বিভীষিকাময় রাতে কী ঘটেছিল?

আজ থেকে ঠিক ১০ বছর আগে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই, বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত হয় সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলাগুলোর একটি। রাজধানীর গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র জঙ্গিদের হামলায় নিহত হন ২২ জন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১৭ জন বিদেশি নাগরিক, দুইজন বাংলাদেশি, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান এবং দায়িত্ব পালনকালে দুই পুলিশ কর্মকর্তা।

এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের ভয়াবহতা, আতঙ্ক এবং নিহতদের স্মৃতি আজও বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।


 যেভাবে শুরু হয়েছিল হামলা

২০১৬ সালের ১ জুলাই, শুক্রবার রাত প্রায় ৮টা ৪৫ মিনিটে গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কে অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রবেশ করে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কয়েকজন জঙ্গি। তারা রেস্তোরাঁয় অবস্থানরত দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। খবর পেয়ে প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় গুলশান থানার একটি পুলিশ টহল দল। পরবর্তীতে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন। জঙ্গিদের গুলিতে বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন এবং ডিবির সহকারী কমিশনার রবিউল করিম নিহত হন।

 কেন রাতেই অভিযান চালানো হয়নি?

জিম্মিদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাতেই পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং পরদিন ভোরে বিশেষ কমান্ডো অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

 অপারেশন ‘থান্ডারবোল্ট’

২ জুলাই সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে শুরু হয় অপারেশন থান্ডারবোল্ট। মাত্র কয়েক মিনিটের তীব্র অভিযানের মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে।

অভিযানের ফলাফল:

* ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

* হামলায় অংশ নেওয়া ৫ জঙ্গি নিহত হয়।

* একজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়।

* রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহতদের মধ্যে কারা ছিলেন?

হামলায় নিহত ২২ জনের মধ্যে ছিলেন—

* ১৭ জন বিদেশি নাগরিক (ইতালি, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের)

* ২ জন বাংলাদেশি

* ১ জন বাংলাদেশি-আমেরিকান

* দায়িত্ব পালনকালে নিহত ২ জন পুলিশ কর্মকর্তা

এই হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

 তদন্তে কী উঠে আসে?

হামলার পর তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, হামলাকারীরা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও তারা সবাই ছিল **দেশীয় উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সদস্য**, যাদের "নব্য জেএমবি" নামে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে ধারাবাহিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা, অর্থদাতা ও সক্রিয় সদস্যদের অনেকেই নিহত বা গ্রেপ্তার হন। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মতে, এসব অভিযানের ফলে দেশে সংগঠিত জঙ্গি তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

 মামলার বিচার

২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলার রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে—৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১ জনকে খালাস প্রদান করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়।

 বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা রেখে গেছে এই হামলা?

হলি আর্টিজান হামলার পর দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। গোয়েন্দা নজরদারি, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, সাইবার মনিটরিং এবং আন্তঃবাহিনী সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা হয়। উগ্রবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

 ১০ বছর পরও স্মরণে সেই রাত

২০২৬ সালে এসে হলি আর্টিজান হামলার এক দশক পূর্ণ হলো। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি জঙ্গি হামলার স্মৃতি নয়; বরং এটি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় দৃঢ় অবস্থান, নিরাপত্তা বাহিনীর আত্মত্যাগ এবং নিরীহ মানুষের জীবনের মূল্যকে স্মরণ করার একটি দিন। নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং আহতদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে বাংলাদেশ আজও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত থাকবে।



Image

আপনার মতামত লিখুন

Editorial News 24

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর: ২০১৬ সালের সেই বিভীষিকাময় রাতে কী ঘটেছিল?

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬

featured Image

আজ থেকে ঠিক ১০ বছর আগে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই, বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত হয় সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলাগুলোর একটি। রাজধানীর গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র জঙ্গিদের হামলায় নিহত হন ২২ জন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১৭ জন বিদেশি নাগরিক, দুইজন বাংলাদেশি, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান এবং দায়িত্ব পালনকালে দুই পুলিশ কর্মকর্তা।

এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের ভয়াবহতা, আতঙ্ক এবং নিহতদের স্মৃতি আজও বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।


 যেভাবে শুরু হয়েছিল হামলা

২০১৬ সালের ১ জুলাই, শুক্রবার রাত প্রায় ৮টা ৪৫ মিনিটে গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কে অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রবেশ করে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কয়েকজন জঙ্গি। তারা রেস্তোরাঁয় অবস্থানরত দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। খবর পেয়ে প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় গুলশান থানার একটি পুলিশ টহল দল। পরবর্তীতে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন। জঙ্গিদের গুলিতে বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন এবং ডিবির সহকারী কমিশনার রবিউল করিম নিহত হন।

 কেন রাতেই অভিযান চালানো হয়নি?

জিম্মিদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাতেই পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং পরদিন ভোরে বিশেষ কমান্ডো অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

 অপারেশন ‘থান্ডারবোল্ট’

২ জুলাই সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে শুরু হয় অপারেশন থান্ডারবোল্ট। মাত্র কয়েক মিনিটের তীব্র অভিযানের মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে।

অভিযানের ফলাফল:

* ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

* হামলায় অংশ নেওয়া ৫ জঙ্গি নিহত হয়।

* একজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়।

* রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহতদের মধ্যে কারা ছিলেন?

হামলায় নিহত ২২ জনের মধ্যে ছিলেন—

* ১৭ জন বিদেশি নাগরিক (ইতালি, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের)

* ২ জন বাংলাদেশি

* ১ জন বাংলাদেশি-আমেরিকান

* দায়িত্ব পালনকালে নিহত ২ জন পুলিশ কর্মকর্তা

এই হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

 তদন্তে কী উঠে আসে?

হামলার পর তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, হামলাকারীরা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও তারা সবাই ছিল **দেশীয় উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সদস্য**, যাদের "নব্য জেএমবি" নামে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে ধারাবাহিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা, অর্থদাতা ও সক্রিয় সদস্যদের অনেকেই নিহত বা গ্রেপ্তার হন। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মতে, এসব অভিযানের ফলে দেশে সংগঠিত জঙ্গি তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

 মামলার বিচার

২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলার রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে—৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১ জনকে খালাস প্রদান করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়।

 বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা রেখে গেছে এই হামলা?

হলি আর্টিজান হামলার পর দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। গোয়েন্দা নজরদারি, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, সাইবার মনিটরিং এবং আন্তঃবাহিনী সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা হয়। উগ্রবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

 ১০ বছর পরও স্মরণে সেই রাত

২০২৬ সালে এসে হলি আর্টিজান হামলার এক দশক পূর্ণ হলো। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি জঙ্গি হামলার স্মৃতি নয়; বরং এটি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় দৃঢ় অবস্থান, নিরাপত্তা বাহিনীর আত্মত্যাগ এবং নিরীহ মানুষের জীবনের মূল্যকে স্মরণ করার একটি দিন। নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং আহতদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে বাংলাদেশ আজও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত থাকবে।




Editorial News 24


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
google.com, pub-1718561036151648, DIRECT, f08c47fec0942fa0