ইরান যুদ্ধে কৌশলগত ব্যর্থতার মুখে যুক্তরাষ্ট্র: নিউইয়র্ক টাইমস
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ছয় মাসের সামরিক অভিযান চালিয়েও নিজের ঘোষিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক সক্ষমতায় ওয়াশিংটন বহুদূরে এগিয়ে থাকলেও তেহরানের মূল নীতি কিংবা আঞ্চলিক আচরণে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থাকে দেশটির পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা একটি বড় ধরনের কৌশলগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।শুক্রবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সাবেক কূটনীতিক, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতামত তুলে ধরে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদের ওপর অভূতপূর্ব চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির সীমা স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির কাছে ওয়াশিংটনের সামরিক ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতার এক স্পষ্ট বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সামরিক চাপের মুখেও ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিকে তেহরান এখনও তাদের শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সম্প্রতি ইরান ও ওমানের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনাকে এই সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ফলে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে এই প্রণালি ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।সংবাদপত্রটির মূল্যায়নে বলা হয়, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে কৌশলগত মতপার্থক্য তীব্র রূপ নিয়েছে এবং উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করার প্রবণতা দেখাচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম উৎস হিসেবে দেখার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।যুদ্ধের এমন অচলাবস্থা দেখে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেও চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান, চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ এ বিষয়ে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অনুধাবন করছে যে চলমান সংঘাত তাদের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। ফলে তারা একক মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরির পথ খুঁজছে।ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যেও মার্কিন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি, ন্যাটো নিয়ে অস্পষ্ট অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির ধারাবাহিকতা না থাকা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সাবেক পরিচালক রবিন নিবলেটের মতে, যুদ্ধের এ পর্যন্ত অর্জিত ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের জন্য একটি বড় কৌশলগত ব্যর্থতা। এর ফলে মার্কিন নিরাপত্তার ওপর আন্তর্জাতিক মিত্রদের যে আস্থা ছিল, তা চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উপসংহারে বলা হয়, এই সংঘাতের প্রভাব কেবল রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। বর্তমানে কোনো পক্ষই সুস্পষ্ট বিজয়ের কাছাকাছি নেই, ফলে অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা বজায় থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।