ধূমপায়ীদের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক, বাড়ছে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি
ধূমপান ও বায়ুদূষণের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ধূমপায়ী এবং অনিয়ন্ত্রিত দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের রক্তে পরিবেশ থেকে প্রবেশ করা অতিক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, রক্তে এসব ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির সঙ্গে সরাসরি হার্ট অ্যাটাকের একটি গভীর ও শক্তিশালী সম্পর্কের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা।ইতালির রোমের সাপিয়েঞ্জা ইউনিভার্সিটির সান্ত'আন্দ্রেয়া হাসপাতালের একদল গবেষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন বিজ্ঞানী পাসকুয়ালে পাওলিসো। এই গবেষণায় কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত রোগীদের হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি বা রক্তনালি থেকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। মোট ৬১ জন রোগীর রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে প্লাস্টিক কণার ক্ষতিকর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেন চিকিৎসকেরা। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু রোগী সদ্য হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত, কিছু রোগী অন্যান্য হৃদ্রোগে আক্রান্ত কিন্তু হার্ট অ্যাটাক হয়নি এবং কিছু সুস্থ রক্তনালির ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।গবেষণার চমকপ্রদ ফলাফলে দেখা গেছে, সম্প্রতি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ৮৪ শতাংশের রক্তপ্রবাহে স্পষ্টভাবেই মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বিদ্যমান ছিল। অন্যদিকে, হৃদ্রোগের লক্ষণ থাকলেও যারা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হননি, তাদের ক্ষেত্রে এই উপস্থিতি ছিল ৪০ শতাংশ। আর সম্পূর্ণ সুস্থ রক্তনালি থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ শতাংশের রক্তে এই জাতীয় অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো ধূমপান এবং বায়ুদূষণের যৌথ প্রভাব। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের রক্তে উচ্চমাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার সম্ভাবনা প্রায় ছয় গুণ বেশি। একইভাবে, যারা প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করেন বা কাজ করেন, তাদের রক্তেও একই ধরনের বিষাক্ত প্লাস্টিক কণা জমা হওয়ার তীব্র প্রবণতা ধরা পড়েছে। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ধূমপান এবং বায়ুদূষণ—এই দুই ধরনের ঝুঁকির মধ্যেই থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির রক্তেই ক্ষতিকর মাত্রায় প্লাস্টিক কণা সনাক্ত করা গেছে। বিপরীতে, এই দুই ঝুঁকির কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত না থাকা ব্যক্তিদের মাত্র ১২ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্লাস্টিকের উপস্থিতি দেখা গেছে।মেডিকেল বিজ্ঞানীদের মতে, ধূমপান ও বায়ুদূষণের কারণে মানুষের ফুসফুসের প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকা অতিক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক ফুসফুস ভেদ করে সরাসরি মানবদেহের রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার মূল লেখক পাসকুয়ালে পাওলিসো জানান, ধূমপান ও দূষিত বায়ুর ধোঁয়া এই ক্ষতিকর কণাগুলোকে শরীরের গভীরে পৌঁছে দিতে প্রত্যক্ষ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।তবে গবেষণার সিনিয়র লেখক এমানুয়েলে বারবাতো সতর্ক করে উল্লেখ করেছেন, এই গবেষণাটি মাইক্রোপ্লাস্টিকই সরাসরি হার্ট অ্যাটাক ঘটাচ্ছে—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ এখনই দেয় না। তবে পরিবেশগত বিষাক্ত দূষণ, রক্তপ্রবাহে ক্ষতিকর প্লাস্টিকের জমা হওয়া এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মাত্র ৬১ জন রোগীর ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয়েছে, তাই প্লাস্টিক কণা ঠিক কীভাবে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে তা নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করতে আগামীতে আরও বড় পরিসরে গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।