উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
||
ইসরায়েলের সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলারের বড় একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে গ্রিস। চুক্তির আওতায় ইসরায়েল থেকে বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনবে এথেন্স। দুই দেশের মধ্যে এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি।সোমবার তেল আবিবে চুক্তিটি সই হয়। এমন সময়ে এই চুক্তি হলো, যখন একদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধও পুরোপুরি কাটেনি। পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে।সব মিলিয়ে গ্রিসের এমন বড় অস্ত্রচুক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় নয়, বরং পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।চুক্তিতে থাকছে যেসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির প্রধান অংশ ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে একটি সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এতে কয়েক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করবে।এর মধ্যে রয়েছে ‘ডেভিডস স্লিং’, যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি থেকে দীর্ঘপাল্লার রকেট প্রতিহত করতে সক্ষম। ইসরায়েলের দাবি, প্রায় ৪০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরত্বের বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় এটি ব্যবহার করা যায়।আরেকটি ব্যবস্থা ‘স্পাইডার’। রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের তৈরি এই ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিচু উচ্চতায় উড়ে আসা বিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও বিভিন্ন নির্দেশিত অস্ত্র ঠেকাতে তৈরি করা হয়েছে।চুক্তিতে থাকছে ‘বারাক এমএক্স’ও। ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি এই ব্যবস্থা যুদ্ধবিমান, ড্রোন, হেলিকপ্টারসহ ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ব্যবহার করা যায়।এ ছাড়া আকাশসীমা নজরদারির জন্য একাধিক রাডার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর একটি কমান্ড সেন্টারও সরবরাহ করবে ইসরায়েল। এই কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশকে একসঙ্গে পরিচালনা করা হবে।এর বাইরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ইউরো বা ৩ কোটি ডলারের আরেকটি চুক্তিতে গ্রিসকে ড্রোন প্রতিরোধী ‘ড্রোন ডোম’ ব্যবস্থাও দেবে ইসরায়েল।এখনই কেন এত বড় চুক্তি?নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত গ্রিসের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়লে অঞ্চলটির মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও মিত্র দেশগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।গ্রিসে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটি থাকায় পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাবেক অস্ট্রীয় প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই মনে করেন, ভবিষ্যতে ইরানের হামলার লক্ষ্য হতে পারে গ্রিসে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো।বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও এর সরবরাহ ও ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় ইউরোপের কিছু দেশ ইসরায়েলি প্রযুক্তির দিকে আগ্রহী হচ্ছে। তুরস্কও বড় কারণ?গ্রিসের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় ইরানের সম্ভাব্য হুমকির পাশাপাশি তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।এজিয়ান সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সামুদ্রিক সীমা, দ্বীপ এবং বিভিন্ন বিতর্কিত অঞ্চল নিয়ে গ্রিস ও তুরস্কের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ থাকলেও মূল বিরোধগুলোর পুরোপুরি সমাধান হয়নি।বিশেষ করে তুরস্কের ড্রোন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ায় গ্রিসও নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের ধারণা, গ্রিস এজিয়ান অঞ্চলে ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’-এর কিছু অংশ মোতায়েন করতে পারে। এতে তুরস্কের ড্রোনসহ বিভিন্ন আকাশপথের সক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সহজ হবে।তবে নতুন চুক্তি নিয়ে তুরস্ক এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।ইসরায়েল নিয়ে গ্রিসেও বিতর্কইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সিদ্ধান্ত গ্রিসের ভেতরেও বিতর্ক তৈরি করেছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গ্রিসের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।জুনে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, গ্রিসের প্রায় ৭৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন না যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক বিষয়ে সঠিক ভূমিকা পালন করবেন।বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশটির কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও সরকারের ইসরায়েলঘনিষ্ঠ নীতির সমালোচনা করেছেন। তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, আঞ্চলিক রাজনীতিতে গ্রিসকে ইসরায়েলের স্বার্থে ব্যবহার করা হতে পারে।গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিসও সরকারের ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এই সম্পর্ক গ্রিসের জনগণের অবস্থান, আঞ্চলিক শান্তি এবং ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বদলে যেতে পারে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের হিসাবগ্রিসের সঙ্গে ইসরায়েলের এই ৩৫০ কোটি ডলারের চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এথেন্সের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে ইসরায়েলও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো সদস্য একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার সুযোগ পাবে।ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, গ্রিস-তুরস্কের দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং ইসরায়েল-তুরস্কের টানাপোড়েন—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে চুক্তিটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়।এখন দেখার বিষয়, এই অস্ত্রচুক্তি গ্রিসের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে সামরিক প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে দেয় কি না। একই সঙ্গে গাজা ইস্যুতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের দূরত্ব তৈরি হলেও গ্রিস কতটা ঘনিষ্ঠভাবে তেল আবিবের পাশে থাকে, সেটিও নজরে থাকবে।সূত্র: আল-জাজিরা