উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
||
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনই একটি চলমান বিশ্বকোষ। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মরক্কোর কিংবদন্তি পরিব্রাজক আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা, যিনি শুধু একজন ভ্রমণকারী ছিলেন না; ছিলেন ইতিহাসের এক নির্ভরযোগ্য সাক্ষী। তাঁর লেখা 'আর-রিহলা' (The Rihla) মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্ব, আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন এবং বাংলার ইতিহাস জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস।হজের উদ্দেশ্যে শুরু, ইতিহাসের দীর্ঘতম সফরের সূচনা৭২৫ হিজরির ২ রজব (১৪ জুন ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দ)। মাত্র ২১ বছর বয়সে মরক্কোর তানজাহ (ট্যাঞ্জিয়ার) শহর থেকে একা যাত্রা শুরু করেন ইবনে বতুতা। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র মক্কায় হজ পালন।তবে সেই যাত্রা আর শুধু হজে সীমাবদ্ধ থাকেনি।হজ শেষে দেশে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি একের পর এক দেশ ভ্রমণ করতে থাকেন। প্রায় ২৯ বছর ধরে চলা এই সফরে তিনি আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করেন। সে সময়ের যাতায়াত ব্যবস্থা বিবেচনায় এটি ছিল প্রায় অকল্পনীয় একটি অর্জন।তিন মহাদেশে এক পরিব্রাজকের পদচারণাইবনে বতুতার সফরের বিস্তৃতি ছিল বিস্ময়কর। তিনি উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা, মিশর, আরব উপদ্বীপ, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইরান, ইয়েমেন, ওমান, পূর্ব আফ্রিকা, আনাতোলিয়া, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, বাংলা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীন পর্যন্ত ভ্রমণ করেন।তিনি যে অঞ্চলগুলো সফর করেছেন, সেগুলোর সামাজিক জীবন, প্রশাসন, বাণিজ্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা এবং মানুষের জীবনযাত্রার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। ফলে তাঁর ভ্রমণকাহিনি শুধু সাহিত্য নয়, ইতিহাস গবেষণারও একটি অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে।দিল্লির সুলতানের দরবারেআফগানিস্তানের কাবুল, পেশোয়ার ও মুলতান অতিক্রম করে ইবনে বতুতা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেন।১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লিতে পৌঁছালে তখন শাসন করছিলেন সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক। জ্ঞান, বিচারবুদ্ধি এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রে দক্ষতার কারণে সুলতান তাঁকে দিল্লির কাজি (বিচারক) হিসেবে নিয়োগ দেন।প্রায় সাত বছর তিনি দিল্লিতে অবস্থান করেন। পরে সুলতান তাঁকে চীনের সম্রাটের কাছে দূত হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই দূতিয়ালির পথেই তাঁর বাংলা সফর।১৩৪৬ সালে বাংলায় আগমনচীনের উদ্দেশ্যে যাত্রার পথে ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে ইবনে বতুতা বাংলায় পৌঁছান।তখন বাংলার শাসক ছিলেন সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ। তাঁর শাসনামলে বাংলা কার্যত দিল্লির নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন সুলতানিতে পরিণত হয়েছিল।ইবনে বতুতার বর্ণনায় সে সময়ের বাংলা ছিল সমৃদ্ধ, উর্বর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।সোনারগাঁও: বাংলার বাণিজ্যিক রাজধানীইবনে বতুতার লেখায় বারবার উঠে এসেছে সোনারগাঁও-এর নাম।তিনি এটিকে একটি সমৃদ্ধ বন্দরনগরী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথে সোনারগাঁও ছিল গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে আরব, পারস্য, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বণিকদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত।তিনি বাংলার সূক্ষ্ম বস্ত্র, কৃষিপণ্য এবং নদীপথের বাণিজ্যেরও প্রশংসা করেছেন।চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রযাত্রাইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে চট্টগ্রামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।এই বন্দর থেকেই তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুমাত্রা হয়ে চীনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তাঁর লেখায় চট্টগ্রামের সামুদ্রিক গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎবাংলা সফরের অন্যতম আলোচিত অংশ হলো সিলেটে অবস্থানরত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিবরণ।ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তে তিনি একজন খ্যাতিমান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ এই ব্যক্তিকে শাহজালাল (রহ.) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যদিও কিছু গবেষণায় এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে।তবে এটি স্পষ্ট যে, সে সময় বাংলায় ইসলামের আধ্যাত্মিক চর্চা এবং সুফি সংস্কৃতি বিদেশি পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করেছিল।কেন বাংলাকে বলেছিলেন ‘দোজখ-ই-পুর নিয়ামত’?ইবনে বতুতার সবচেয়ে বিখ্যাত মন্তব্যগুলোর একটি হলো বাংলাকে "দোজখ-ই-পুর নিয়ামত" বলে অভিহিত করা।এর আক্ষরিক অর্থ—"নিয়ামতে পরিপূর্ণ দোজখ"।এই উপমার পেছনে ছিল বাংলার প্রকৃতি ও জলবায়ু সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা।উত্তর আফ্রিকার শুষ্ক আবহাওয়া থেকে আসা একজন ভ্রমণকারীর কাছে বাংলার আর্দ্রতা, বর্ষার অঝোর বৃষ্টি, অসংখ্য নদী, জলাবদ্ধতা ও ঘন কুয়াশা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। স্থলপথের পরিবর্তে নদীপথে চলাচল ছিল এখানে প্রায় অপরিহার্য।কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বাংলার উর্বর মাটি, কৃষিসম্পদ, ফলমূল, খাদ্যের প্রাচুর্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার প্রশংসাও করেছেন। অর্থাৎ, পরিবেশ ছিল তাঁর কাছে কঠিন, কিন্তু সম্পদ ও প্রাচুর্য ছিল বিস্ময়কর। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বাংলাকে "দোজখ-ই-পুর নিয়ামত" নামে অভিহিত করেন।‘আর-রিহলা’: ইতিহাসের অমূল্য দলিলস্বদেশে ফিরে মরক্কোর সুলতানের নির্দেশে ইবনে বতুতা তাঁর দীর্ঘ সফরের স্মৃতিচারণ করেন। সেই বর্ণনার ভিত্তিতে রচিত হয় বিখ্যাত গ্রন্থ 'আর-রিহলা'।এই বই আজও মধ্যযুগের ইতিহাস গবেষণার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।ইতিহাসে ইবনে বতুতার গুরুত্বমার্কো পোলোর পাশাপাশি ইবনে বতুতাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিব্রাজক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সফরের বিস্তৃতি এবং মুসলিম বিশ্বের গভীর পর্যবেক্ষণের দিক থেকে তিনি মার্কো পোলোকেও অতিক্রম করেছিলেন।তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তের মাধ্যমে মধ্যযুগের বাংলার বন্দর, বাণিজ্য, শাসনব্যবস্থা, সুফি সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার যে চিত্র পাওয়া যায়, তা ইতিহাসের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।উপসংহারইবনে বতুতার বাংলা সফর ছিল কেবল একজন পর্যটকের ভ্রমণ নয়; এটি ছিল মধ্যযুগের বাংলাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। তাঁর চোখে দেখা বাংলা ছিল একদিকে নদীমাতৃক, আর্দ্র ও দুর্ভেদ্য; অন্যদিকে উর্বর, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময়।প্রায় সাতশ বছর আগে লেখা তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত আজও আমাদের জানায়—বাংলা শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, বরং মধ্যযুগের বৈশ্বিক বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।