উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
||
লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম. আতিকুর রহমান (১৯৩১–২০২৩): দুই দেশের সামরিক ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়-বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পঞ্চম সেনাপ্রধান, সাবেক বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) মহাপরিচালক এবং একজন পেশাদার সামরিক নেতা হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম. আতিকুর রহমান (১৯৩১–২০২৩) বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন পর্যন্ত দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও নেতৃত্বের অসংখ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। জন্ম ও শিক্ষাজীবন১৯৩১ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন এম. আতিকুর রহমান। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার রাওয়ালপিন্ডিতে চলে যায়, যেখানে তাঁর পিতা তৎকালীন পাকিস্তান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন।রাওয়ালপিন্ডির গর্ডন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (বি.এসসি.) সম্পন্ন করার পর ১৯৫১ সালের ২৮ আগস্ট পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির (PMA) ৯ম লং কোর্সে যোগদান করেন। ১৯৫৪ সালের ১৩ মার্চ আর্টিলারি রেজিমেন্টে কমিশন লাভের মাধ্যমে তাঁর সামরিক জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মজীবনপাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—* ২০ হেভি অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট (HAA) আর্টিলারি রেজিমেন্টে দায়িত্ব পালন।* আইএসএসবি-তে গ্রাউন্ড টেস্টিং অফিসার (GTO) হিসেবে কর্মরত থাকা।* লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে ১৩ লাইট অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট (LAA) রেজিমেন্টের অধিনায়কত্ব।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নতুন অধ্যায়বাংলাদেশে ফিরে তিনি গোলন্দাজ বাহিনীর পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালের ১৫ মে কর্নেল পদে পদোন্নতি পান এবং বাংলাদেশ আর্টিলারি রেজিমেন্টের প্রথম **Colonel Commandant** হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭৫–১৯৭৭: গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি সেনা সদর দপ্তরে পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একই বছরের ২৩ অক্টোবর তাঁকে চট্টগ্রামের ৬৫তম স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।১৯৭৬ সালের ১৯ এপ্রিল ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং চট্টগ্রামের ২৪তম পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পরবর্তীতে সেনা সদর দপ্তরের কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (QMG) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।বিডিআরের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদের মহাপরিচালক১৯৭৭ সালের ২৫ আগস্ট মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভের পর একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ)-এর মহাপরিচালক (Director General) হিসেবে নিয়োগ পান।১৯৮২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত টানা প্রায় সাড়ে চার বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন, যা বিডিআরের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদের মহাপরিচালক হিসেবে একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড।তাঁর নেতৃত্বে—* সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার হয়।* চোরাচালানবিরোধী অভিযান আরও কার্যকর হয়।* পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হয়। সেনাপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ববিডিআরের দায়িত্ব শেষে তিনি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (PSO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে যোগ দেন। একই বছরের ৩১ আগস্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করে বাংলাদেশের পঞ্চম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা, প্রশিক্ষণ এবং পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০-এর দশকের ধারাবাহিক সামরিক অস্থিরতার পর সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠনে তাঁর নেতৃত্ব বিশেষভাবে প্রশংসিত। আন্তর্জাতিক সম্মাননাসামরিক নেতৃত্ব ও পেশাদার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন।Legion of Merit (যুক্তরাষ্ট্র)Order of Military Merit (জর্ডান)শেষ জীবনদীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর। ৯২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় ঢাকার বনানী সামরিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। উত্তরাধিকারলেফটেন্যান্ট জেনারেল এম. আতিকুর রহমান ছিলেন এমন একজন সামরিক কর্মকর্তা, যিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের দুই ভিন্ন সময়ের সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন, গোলন্দাজ বাহিনীর বিকাশ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং সেনাবাহিনীতে পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।শৃঙ্খলা, সততা, দায়িত্ববোধ ও পেশাদার নেতৃত্বের জন্য তিনি বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।