উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
||
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেশে আবারও বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু জ্বরের সংক্রমণ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম কয়েক মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও মে মাসের শেষ দিক থেকে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। জুনে বৃষ্টিপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সংক্রমণও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, কক্সবাজার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে।চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক রোগ নয়। দেশের প্রায় সব অঞ্চলে এডিস মশার বিস্তার ঘটেছে। ফলে গ্রামাঞ্চলেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই প্রাথমিকভাবে সাধারণ জ্বর মনে করে চিকিৎসা নিতে দেরি করায় জটিলতা বাড়ছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৪৪ জন এবং মারা গেছেন ৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কে সাধারণত ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। তাই মৌসুমের শুরুতেই আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিঁটে ব্যথা, বমি ও দুর্বলতার উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরীক্ষার পর তাদের একটি অংশের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, চলতি বছর ডেঙ্গুর পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার বেশিরভাগ এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার ওপরে রয়েছে। কিছু এলাকায় এ সূচক ৯৩ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যেখানে ২০-এর বেশি হলেই পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়।তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু এখন শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চল, কক্সবাজার এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক।বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই বছরে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অনেক এলাকায় মশার প্রকৃত বিস্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও কাঙ্ক্ষিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। তাদের আশঙ্কা, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাড়ির ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র বা জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা জরুরি।চিকিৎসকদের মতে, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এমন ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে গুরুতর জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।তারা আরও জানান, জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ডেঙ্গুর জটিল পর্যায় অনেক ক্ষেত্রে জ্বর সেরে যাওয়ার পর শুরু হয়। এ সময় শ্বাসকষ্ট, তীব্র পেটব্যথা, বমি, রক্তক্ষরণ বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি পরিবারকে নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে চলতি বর্ষা মৌসুমে দেশ আবারও বড় ধরনের ডেঙ্গু সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।