দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে নতুন একটি চার দেশীয় আঞ্চলিক ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। প্রস্তাবিত এই ফোরামে বাংলাদেশ, চীন, মিয়ানমার ও পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ইসলামাবাদ মূলত ভারতকে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে, যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
পাকিস্তান এমন এক সময়ে এই প্রস্তাব সামনে এনেছে, যখন বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন খুবই কাছাকাছি। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের জোট নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। নির্বাচিত সরকার চাইলে ভবিষ্যতে বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
সূত্র মতে, গত ২৪ জানুয়ারি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার টেলিফোনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে এই চার দেশীয় আঞ্চলিক বৈঠকের প্রস্তাব দেন। তিনি নির্বাচনের আগেই একটি বৈঠক আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত বিষয়টি স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান।
ত্রিদেশীয় উদ্যোগ থেকে চার দেশীয় প্রস্তাব
চার দেশীয় ফোরামের ধারণা একেবারে নতুন নয়। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে চীন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় ফোরাম গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। চীনের কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ প্রস্তাব উত্থাপিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরে এ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে বাংলাদেশ সম্মতি না দেওয়ায় সে উদ্যোগ আর এগোয়নি।
তখন বাংলাদেশের অবস্থান ছিল—শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো দেশ যুক্ত না হলে দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের জোট কার্যকর হবে না। পাকিস্তানের সঙ্গে ওই দেশগুলোর একই জোটে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় আলোচনা থেমে যায়। এবার মিয়ানমারকে যুক্ত করে চার দেশীয় ফোরামের প্রস্তাব সামনে এনেছে ইসলামাবাদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সবসময় সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর ভিত্তি করে চলে। যে কোনো উদ্যোগ আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ালে বাংলাদেশ তাতে যুক্ত হবে না।
কেন বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সামরিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহ দেখায় নতুন সরকার। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনা নিয়েও আলোচনা চলছে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যেই চার দেশীয় ফোরামের প্রস্তাব নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সার্ক দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকায় আঞ্চলিক সহযোগিতায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান এমন একটি জোট চায়, যেখানে ভারত থাকবে না, কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন থাকবে। অন্যদিকে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চায়। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে চীনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে, যা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারতের সীমান্ত, ফলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে চীন ও পাকিস্তান। এই ফোরামের মাধ্যমে ভারতকে চাপের মুখে ফেলাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের প্রতি রাজনৈতিক বার্তা
নির্বাচনের আগে এই প্রস্তাবকে অনেকেই ভারতের প্রতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অস্বস্তির বিষয়টি স্বীকার করেছেন খোদ পররাষ্ট্র উপদেষ্টাও। তিনি জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চাইলেও তা বাস্তবে সম্ভব হয়নি।
এদিকে দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে বেশি মনোযোগী ছিল, ফলে ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ভৌগোলিক ও বাস্তব কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুব বেশি বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ঠিক আগে পাকিস্তানের চার দেশীয় ফোরাম প্রস্তাব দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করলেও, এতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








