জেন–জি বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এক স্বৈরশাসকের পতনের পর বাংলাদেশে আগামী বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। লাখো তরুণ-তরুণী আশা করেছিলেন, এই আন্দোলন দেশকে একটি নতুন পথে এগিয়ে নেবে।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে টানা বিক্ষোভের মুখে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে দেশ ছাড়েন। বিক্ষোভকারীরা তাঁর সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। এই আন্দোলন নেপাল ও মাদাগাস্কারের মতো দেশেও দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়েছে।
১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে জাল নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র মির্জা শাকিল সিএনএনকে বলেন, ‘এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে—জেন–জি চাইলে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে।’
তবে হাসিনা–পরবর্তী বাংলাদেশে নেতৃত্বের দৌড়ে যাঁরা এগিয়ে আছেন, তাঁরা সেই রাজপথের তরুণ আন্দোলনকারীদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শীর্ষ দুই প্রার্থীর একজন ষাট বছর বয়সী প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি, যার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। অন্যজন ৬৭ বছর বয়সী ইসলামপন্থী নেতা, যার দল এবারের নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরেক শিক্ষার্থী সাদমান মুজতবা রাফিদ রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম ও জাতিনির্বিশেষে সবার সমান সুযোগ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে যা দেখছি, তা আমাদের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে।’
গুরুত্বপূর্ণ এক নির্বাচন
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়েই হাসিনার পতনের সূচনা হয়। আন্দোলন দমাতে সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানালে স্পষ্ট হয়ে যায়, হাসিনার শাসনের অবসান আসন্ন।
২০২৪ সালের আগস্টে বিক্ষোভকারীরা তাঁর সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। পরে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। গত নভেম্বরে ঢাকার একটি আদালত সেই সময়কার সহিংসতার দায়ে অনুপস্থিতিতেই তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।
বর্তমানে বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানালেও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। এই ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কেও অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। আসন্ন নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক মাঠে বড় পরিবর্তন এসেছে।
এই পরিস্থিতি ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। দলটির নেতা তারেক রহমান ১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে এসেছেন এবং নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনরুত্থানও চোখে পড়ছে।
অন্যদিকে, ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহিংস ও জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গড়ার ঘোষণায় দলটি সমালোচনার মুখে পড়ে।
লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওমি হোসেন সিএনএনকে বলেন, এই জোট মূলত নিরাপত্তার স্বার্থে করা হয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশে সংসদ সদস্য পদ অনেকের কাছে এক ধরনের সুরক্ষার প্রতীক।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রার্থী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ—এমন অভিযোগও উঠেছে।
এই বাস্তবতা আন্দোলনের সময় তরুণদের যে আশার জন্ম হয়েছিল, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী নাজিফা জান্নাত বলেন, ‘সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তির কথা বলা একটি দলের পক্ষ থেকে নারী প্রার্থী না দেওয়া দলের সঙ্গে জোট করা বিশ্বাসঘাতকতার মতো।’
সব বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও, অনেকেই এই ভোটকে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে দেখছেন। ঢাকার রাজপথে ইতোমধ্যে নির্বাচনী উত্তাপ স্পষ্ট। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শাকিলের ভাষায়, ‘এই নির্বাচন হয়তো সত্যিই নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারে।’








