আবারও ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইরান সরকার। চলমান আন্দোলন থেকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিলেও প্রাণহানির খবর এড়ানো যায়নি। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ছে, যা ইরান সরকারকে আরও চাপে ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—চলমান বিক্ষোভ সামাল দিতে পারবে কি না তেহরান, নাকি খামেনি প্রশাসনের জন্য এটি বড় কোনো রাজনৈতিক সংকেত হয়ে উঠছে।
দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে বর্তমান সরকারবিরোধী ক্ষোভ হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষই এখন বিস্ফোরণের রূপ নিয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের বড় ধরনের অবমূল্যায়ন এবং নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক সূত্রপাত ঘটায়।
তবে এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কারণ—
- বাধ্যতামূলক হিজাবসহ কঠোর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা, যা নারীরা ক্রমেই প্রকাশ্যে অমান্য করছে
- যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা
- লেবানন, গাজা, ইরাক ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে বিপুল অর্থ ব্যয়
- কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রিত পানি ব্যবস্থাপনা নীতির ফলে খরা ও পানিসংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি
আন্দোলনের বিস্তার
শুরুতে রাজধানী তেহরানের বাজারভিত্তিক ব্যবসায়ী ও দোকানিদের ধর্মঘট থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। তবে গত এক সপ্তাহে এতে যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের কর্মীরা। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর এই আন্দোলন ইরানজুড়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল।
সেই সময় কঠোর দমন-পীড়নের মুখেও প্রতিবাদ থামেনি; বরং বিভিন্ন রূপে তা অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্প ও ইসরায়েলের হুঁশিয়ারি
অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি ইরান এখন নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের ‘হত্যা না করতে’ ইরান সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
একই সঙ্গে ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় জোরদার করে বা ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন সীমিত না করে, তবে সামরিক হামলা চালানো হতে পারে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন।
যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, আগের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়েছে, তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএসহ একাধিক বিশ্লেষক বলছেন, ইরানের মূল পারমাণবিক অবকাঠামো এখনো টিকে আছে।
খামেনির পাল্টা বার্তা
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অত্যাচারী ব্যক্তি’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষী—অত্যাচারীরা কখনো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে খামেনি বলেন,
“ফারাও, নমরুদ ও শাহ পাহলভি ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। ট্রাম্পও পারবেন না। তাকেও ক্ষমতা থেকে নামানো হবে।”
বিক্ষোভকারীদের ‘নাশকতাকারী’ উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, তারা বিদেশি শক্তিকে ইরানে হামলার আহ্বান জানাচ্ছে। জনগণের এই আন্দোলনে সরকার পতন হবে না বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সামনে কী?
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে ইরান এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে, নাকি এই বিক্ষোভ খামেনি প্রশাসনের জন্য বড় কোনো রাজনৈতিক মোড় তৈরি করবে—সে প্রশ্নের উত্তরই এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল, দ্য কনভারসেশন








