ইরানজুড়ে চলমান ইসরায়েল-মার্কিন বিমান হামলা রাশিয়ার কাছে কোনো বড় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। ‘টুয়েলভ ডে ওয়ার’ এবং পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি মস্কোকে সতর্ক করে দিয়েছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত অনিবার্য। এখন ক্রেমলিন কেবল যুদ্ধের সম্ভাবনা নয়, বরং তেহরানে সম্ভাব্য শাসন পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে।
২০১৭–১৮ সালের বিক্ষোভের সময় রাশিয়া দীর্ঘ নীরবতার পর আসাদ সরকারের সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক জটিল ও অনিশ্চিত। ২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের নাটকীয় পতন মস্কোর জন্য বড় ধাক্কা ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে রাশিয়া বুঝতে পারছে, কোনো মিত্রও যেকোনো সময় ক্ষমতাচ্যুত হতে পারে। ইরানেও যদি বর্তমান শাসন পতিত হয়, রাশিয়া সম্ভবত একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করবে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তেহরানের প্রতি নীরব থাকতে পারে।
নতুন সরকারের সঙ্গে মস্কোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাবনা কম। সাধারণ ইরানিদের মধ্যে রাশিয়ার ভাবমূর্তি ইতিমধ্যেই নেতিবাচক। ঊনবিংশ শতাব্দীতে রুশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত দখলের স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে। বর্তমান বিক্ষোভ দমনে রাশিয়ার সরবরাহ করা স্পার্তাক সাঁজোয়া যানও সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়েছে। ইরানীরা এখন রাশিয়াকে শুধু বিদেশি শক্তি নয়, বর্তমান ব্যবস্থার প্রধান রক্ষক হিসেবেও দেখছে।
ইরানের অস্থিতিশীলতা রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পগুলোকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশেষ করে ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর’ (আইএনএসটিসি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এই করিডোর রাশিয়ার জন্য বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার কারণে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করা অসম্ভব হয়ে গেছে।
রাশিয়ার জন্য আঞ্চলিক ‘গ্যাস হাব’ হিসেবে ইরানকে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ব্যাহত হয়েছে। আজারবাইজানের মাধ্যমে পাইপলাইনে রাশিয়ার গ্যাস পাঠিয়ে পারস্য উপসাগরের টার্মিনাল থেকে বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর লক্ষ্য এখন বাস্তবায়নযোগ্য নয়। বিমান হামলা ও অবকাঠামোর ক্ষতি রাশিয়ার জ্বালানি কূটনীতি স্থবির করেছে।
পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও রাশিয়া পিছু হটছে। বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ স্থগিত এবং রুশ বিশেষজ্ঞ ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বিলিয়ন ডলারের হরমুজ পারমাণবিক প্রকল্পও অনিশ্চিত। সিরিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রাশিয়ার তেল কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগও চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০২২ সাল থেকে রাশিয়া ইরানের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী ছিল, যার পরিমাণ অন্তত ৪.২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে রাশিয়া তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাবে কি না, তা অনিশ্চিত। বুশেহর প্রকল্পে ৫০০ মিলিয়ন ইউরো বকেয়া থাকলেও তা সম্ভবত সামান্য অংশ মাত্র। মস্কো ও তেহরান বন্ধুত্বের ফাটল ঢাকতে অনেক তথ্যই গোপন রাখছে।
সূত্র: মস্কো টাইমস








