ইরান ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা এখন আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসছে। অভিযোগ উঠেছে, মস্কো তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, রাশিয়া নাকি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমানের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেছে। এসব তথ্যের মধ্যে স্যাটেলাইট ছবি ও লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত উপাত্তও থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রথমবারের মতো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাশিয়া পরোক্ষভাবে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
এই তথ্যের কারণে ইরানের হামলা আরও নির্ভুল ও প্রাণঘাতী হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে কুয়েতে একটি হামলায় ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এসব হামলার সফলতা সরাসরি রাশিয়ার তথ্যের কারণে হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, আগে ইরানের কাছে উন্নত নজরদারি ও লক্ষ্য নির্ধারণ প্রযুক্তি (আইএসআর) এতটা শক্তিশালী ছিল না। তাই সাম্প্রতিক সময়ে হামলার নির্ভুলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, তারা বাইরের কোনো সহায়তা পাচ্ছে।
যদিও রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও দুই দেশের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই গভীর। গত কয়েক বছরে এই সহযোগিতা আরও বেড়েছে। রাশিয়ায় ইরানের ‘শাহেদ-১৩৯’ ড্রোন তৈরির একটি কারখানা স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে মাসে হাজার হাজার ড্রোন তৈরি করা সম্ভব। এসব ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধেও ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইরান রাশিয়াকে স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করেছে।
শুধু অস্ত্র নয়, স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে। রাশিয়ার উন্নত সামরিক স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর ছবি সংগ্রহ, সংকেত শনাক্তকরণ ও আগাম সতর্কতা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, ইরানও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। রাশিয়ার সহায়তায় ইরান ‘খৈয়াম’ নামের একটি উন্নত স্যাটেলাইট তৈরি করেছে এবং আরও কয়েকটি স্যাটেলাইট নির্মাণের কাজ চলছে। এসব কারণে ধারণা করা হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে, যা ইরানের সামরিক শক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সহযোগিতা এখনও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। এটি ইরানকে চলমান লক্ষ্যবস্তু যেমন বিমানবাহী রণতরীতে আঘাত হানার পূর্ণ সক্ষমতা না দিলেও স্থির লক্ষ্যবস্তু—যেমন সামরিক ঘাঁটি বা বিমানঘাঁটিতে হামলা চালাতে সহায়তা করতে পারে।
এর একটি উদাহরণ হিসেবে ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার চেষ্টার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। ইরান থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঘাঁটিতে হামলার চেষ্টা সফল না হলেও এটি দেখিয়েছে যে ইরান এখন অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
আগে ধারণা করা হতো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা এর চেয়েও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে, যা একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ইরানের এই সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে ইউরোপের অনেক দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
একটি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাব দিয়েছিল—যদি যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে, তাহলে রাশিয়াও ইরানকে তথ্য সরবরাহ বন্ধ করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
সব মিলিয়ে, ইরান ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।








