ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে চার দশক ধরে রাজনীতি করা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর স্বপ্ন এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ২৮ ফেব্রুয়ারি জেরুজালেমে দেওয়া ভাষণে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, এখনই ইরানকে না থামালে তারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ দেখিয়েছে, যে দ্রুত ও নিখুঁত বিজয়ের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে তৈরি ফাটল নেতানিয়াহুর সমীকরণকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের চেয়ে লাভজনক চুক্তিতে আগ্রহী, যা নেতানিয়াহুর আদর্শিক লড়াইকে একা করে দিয়েছে।
ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ড্রোন ও ছায়াযুদ্ধ প্রযুক্তি ইসরায়েলের দ্রুত বিজয়কে বাধাগ্রস্ত করছে। আকাশপথে ইসরায়েলের শক্তি থাকলেও, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ছড়িয়ে থাকা সম্পদ দ্রুত জয়ের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলস্বরূপ, ইসরায়েল এমন এক যুদ্ধে আটকে গেছে যা সৈন্যদের ক্লান্ত করছে এবং জাতীয় মনোবল হ্রাস করছে।
যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে তেলের দাম ২৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলার অতিক্রম করেছে। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে বিশ্বের ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও আমেরিকা ও ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে।
দুই নেতার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা একটি ঐতিহাসিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। নেতানিয়াহু যুদ্ধের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্থবিরতা এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মুখোমুখি হয়েছেন। ট্রাম্প হয়তো যেকোনো সময় বিজয় ঘোষণা করে সরে দাঁড়াবেন, আর নেতানিয়াহু একা এই বিশৃঙ্খলার দায়ভার বহন করবেন।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা বাড়ছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ধকল নিতে পারছে না। নেতানিয়াহুর চার দশকের ইরান-ভীতি ও সামরিক আবেশ এখন রাজনৈতিক পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন কামানের গোলার পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের রাজনৈতিক দর কষাকষির ওপর নির্ভর করছে। নেতানিয়াহু হয়তো শেষ চেষ্টা হিসেবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইবেন, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে তাকে পিছু হটতে হবে। এই জুয়া কেবল তার নয়, পুরো অঞ্চলের ভাগ্যকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।








